রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: বড় ধরনের রাজস্ব সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে নিজস্ব অর্থায়ননির্ভর অর্থনীতিতে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রাজস্ব আদায় বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতির যৌক্তিকীকরণ, কর ফাঁকি ও কর পরিহার বন্ধ এবং পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এ দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব সম্মেলন শুধু রাজস্ব আদায়ের হিসাব-নিকাশ নিয়ে আলোচনা করার জায়গা নয়; এটি জাতীয় ঐকমত্য গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। নিজস্ব অর্থায়নে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথ নির্ধারণে এ সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার অন্যতম বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হিসেবে কম কর-জিডিপি অনুপাতের কথা উল্লেখ করেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে, যা বিশ্বের অন্যতম নিম্ন হার। ২০২৩ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে গড় কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ, বিপরীতে বাংলাদেশের ছিল মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির আকার বাড়লেও সে অনুযায়ী রাষ্ট্রের রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়েনি। এই ব্যবধান কমাতে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর শুধু বাড়তি করের বোঝা চাপিয়ে সমাধান করা যাবে না। বরং করের আওতা সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতি যৌক্তিক করা, কর ফাঁকি ও কর পরিহার বন্ধ এবং অটোমেশনের মাধ্যমে করদাতাদের কমপ্লায়েন্স বাড়াতে হবে।
রাজস্ব প্রশাসনে সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পুরোনো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ভেঙে দুটি স্বতন্ত্র ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর একটি হবে রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং অন্যটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ।
তিনি বলেন, রাজস্ব নীতি বিভাগ সরকারের ‘থিংক ট্যাংক’ হিসেবে কাজ করবে। বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত এ সংস্থা একটি ভারসাম্যপূর্ণ, প্রতিযোগিতামূলক ও উন্নয়নবান্ধব কর কাঠামো প্রণয়ন করবে।
অন্যদিকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ হবে সরকারের ‘অ্যাকশন টিম’। এ বিভাগ রাজস্ব আদায় করবে এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করবে।
কর প্রদান প্রক্রিয়া সহজ করা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য বলে জানান অর্থমন্ত্রী। নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, গবেষক এবং শিল্প-বাণিজ্য সংগঠনের বিশেষজ্ঞদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আগের বছরের তুলনায় এ লক্ষ্যমাত্রা ৪৬ শতাংশ বেশি।
তিনি বলেন, লক্ষ্যমাত্রাটি উচ্চাভিলাষী হলেও তা ইচ্ছাকৃতভাবেই নির্ধারণ করা হয়েছে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে যেতে চায়। দেশের উন্নয়নের অর্থায়ন নিজেদের সম্পদ থেকেই করতে হবে।
রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। এগুলো হলো—আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ ও অংশীদারিত্ব।
তিনি বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থায় এন্ড-টু-এন্ড অটোমেশনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া করদাতাদের কর্মকর্তাদের কাছে যাওয়ার যে প্রচলিত সংস্কৃতি রয়েছে, তা বন্ধ করা হবে।
সরকারের লক্ষ্য সম্পূর্ণ ‘কন্টাক্ট-ফ্রি’ ও ‘ফেসলেস’ রাজস্ব প্রশাসন গড়ে তোলা। এরই মধ্যে ই-ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট, আসিকুডা ওয়ার্ল্ড, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো এবং আধুনিক স্ক্যানিং পদ্ধতির মতো ব্যবসাবান্ধব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের উদ্দেশে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। সরকার ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে চায় না; বরং প্রবৃদ্ধি সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলতে চায়।
তবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যবসায়ীদের সময়মতো কর ও ভ্যাট পরিশোধ করে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে কর পরিহারের সংস্কৃতির সঙ্গে যারা যুক্ত থাকবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার সতর্কবার্তাও দেন অর্থমন্ত্রী। এর মাধ্যমে সৎ করদাতারা যাতে কোনোভাবেই নিরুৎসাহিত না হন, সেটিও নিশ্চিত করা হবে বলে জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাহসী নেতৃত্বেই রাজস্ব খাতের বড় ধরনের সংস্কার সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশ আর ঋণের ওপর নির্ভরশীল দেশ হিসেবে থাকবে না; নিজস্ব অর্থায়নে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৯ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের চ্যালেঞ্জ অতিক্রম এবং ২০৩৪ সালে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ সফল হবে, ইনশাআল্লাহ।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম