বরগুনা প্রতিনিধি: বরগুনার ঐতিহ্যবাহী টাউন হল পৌর অডিটোরিয়ামের নির্মাণকাজ দুই বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আট বছরেও তা শেষ হয়নি। বর্তমানে নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কবে নাগাদ কাজ শেষ হবে, তা জানে না পৌর কর্তৃপক্ষও। দীর্ঘদিন সাংস্কৃতিক চর্চার উপযুক্ত স্থান না থাকায় স্থবির হয়ে পড়েছে জেলার সাংস্কৃতিক অঙ্গন। এতে শিশু-কিশোরদের একটি অংশ মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় বরগুনার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রাণকেন্দ্র ছিল টাউন হল পৌর অডিটোরিয়াম। এখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয় ছিল। নিয়মিত নাটক, গান, আবৃত্তিসহ নানা আয়োজন ঘিরে সরব থাকত পুরো এলাকা। এই মঞ্চ থেকেই উঠে এসেছেন জেলার অনেক সাংস্কৃতিক কর্মী, যারা বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে কাজ করছেন।
তবে পুরোনো ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লে নতুন অডিটোরিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বরগুনা পৌরসভা। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অর্থায়নে ২০১৮ সালে ৫০০ আসনবিশিষ্ট আধুনিক অডিটোরিয়ামের নির্মাণকাজ শুরু হয়। কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এএসি অ্যান্ড এনটি জেভি। চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালের ২৭ মার্চের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পর আরও ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি। সাত কোটি দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন অডিটোরিয়ামটির বিপরীতে এরই মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চার কোটি ৭৯ লাখ ৯৯ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
সাংস্কৃতিক কর্মীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে উপযুক্ত মঞ্চ না থাকায় নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা যাচ্ছে না। ফলে একসময় প্রাণবন্ত থাকা জেলার সাংস্কৃতিক অঙ্গন এখন অনেকটাই স্থবির। একই সঙ্গে শিশু-কিশোরদের অবসর সময় সৃজনশীল কাজে ব্যয় করার সুযোগ কমে যাওয়ায় তাদের একটি অংশ মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বরগুনা খেলাঘরের সভাপতি মুশফিক আরিফ বলেন, বরগুনার সাংস্কৃতিক অঙ্গন একসময় স্বর্ণালী সময় পার করেছে। জেলার একমাত্র বড় সাংস্কৃতিক চর্চাকেন্দ্র টাউন হল পৌর অডিটোরিয়াম প্রায় ১৫-১৬ বছর আগে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এরপর আধুনিক অডিটোরিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আট বছরেও কাজ শেষ হয়নি। কবে কাজ শেষ হবে, সেটিও কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলে সাংস্কৃতিক চর্চার জায়গার অভাবে পুরো অঙ্গন স্থবির হয়ে পড়েছে।
দুর্বার সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভাপতি মো. খান নাঈম বলেন, বরগুনার সাংস্কৃতিক অঙ্গন এখন ধ্বংসের পথে। জায়গার অভাবে মঞ্চনাটকসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়মিত করা যাচ্ছে না। আগে পড়াশোনার পাশাপাশি শিশু-কিশোররা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকত। এতে তারা মাদক ও বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকত। এখন সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ কমে যাওয়ায় শিশু-কিশোরদের একটি অংশ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে অডিটোরিয়ামের নির্মাণকাজ বন্ধ থাকার বিষয়ে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ শেষ করার জন্য একাধিকবার বলা হয়েছে। কিন্তু তারা কাজ এগিয়ে নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন অনেকটাই গা-ঢাকা দিয়েছেন। কাজটি কীভাবে শেষ করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা চাওয়া হবে।
তবে পৌর কর্তৃপক্ষের এ বক্তব্য অস্বীকার করেছেন ঠিকাদার মো. আবুল হোসেন খান। তিনি অভিযোগ করেন, অডিটোরিয়াম নির্মাণের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ পৌর কর্তৃপক্ষ অন্য প্রকল্পে ব্যয় করেছে। ফলে কাজ শেষ করলেও বিল পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বরাদ্দের অর্থ ও বিল পরিশোধের নিশ্চয়তা দেওয়া হলে তিনি আবার কাজ শুরু করে অডিটোরিয়ামের নির্মাণকাজ শেষ করবেন।
বরগুনা পৌরসভার প্রশাসক সজল চন্দ্র শীল বলেন, নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। এ কারণে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব