ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: লোহিত সাগরে সৌদি আরবের একটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। সোমবার ইয়ানবুর উপকূলের কাছে ‘আমজান’ নামের জাহাজটিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করা হয় বলে জানিয়েছে ইরান-ঘনিষ্ঠ এই সশস্ত্র গোষ্ঠী।
হামলার খবর প্রকাশের পর সৌদি আরবও ঘটনাটি নিশ্চিত করেছে। সৌদি নৌপরিবহন সংস্থা বাহরি জানিয়েছে, তাদের আমজান জাহাজ আঞ্চলিক জলসীমায় একটি ‘শত্রুতামূলক ঘটনার’ মধ্যে পড়েছে। হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে জাহাজটিতে হামলা চালানো হয়েছে। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাদের ঘোষিত ‘অবরোধের জবাবে অবরোধ’ অভিযানের অংশ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
হুতিরা সৌদি সামরিক বহরেও হামলার দাবি করেছে। তাদের ভাষ্য, এসব বহরে ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর জন্য সামরিক সরঞ্জাম নেওয়া হচ্ছিল। হুতিদের দাবি, সৌদি ভূখণ্ড থেকে ইয়েমেনে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া এসব সামরিক সরঞ্জামবাহী বহর তাদের লক্ষ্য ছিল।
ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী নামে বিবৃতি দিয়ে হুতিরা জানিয়েছে, তারা সৌদি বাহিনীর বিরুদ্ধে দুটি সামরিক অভিযান চালিয়েছে।
প্রথম অভিযানে সৌদি সামরিক বাহিনীর একটি বড় বহরকে লক্ষ্য করা হয়। ওই বহরে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম ছিল বলে দাবি করেছে হুতিরা। আল-আবর ও আল-ওয়াদিয়াহ এলাকায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়। হুতিদের দাবি, হামলায় অস্ত্রবোঝাই ১০টির বেশি ট্রাকে আগুন ধরে যায় এবং সেগুলো ধ্বংস হয়। এসব ট্রাক সৌদি ভূখণ্ড থেকে ইয়েমেনে হামলা চালানোর জন্য যাচ্ছিল বলে দাবি করেছে গোষ্ঠীটি।
দ্বিতীয় অভিযানে আল-কানাইস এলাকায় সৌদি বাহিনীকে লক্ষ্য করা হয় বলে জানিয়েছে হুতিরা।
তাদের দাবি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে চালানো এই হামলায় কয়েক ডজন সেনা নিহত ও আহত হয়েছেন। নিহত ও আহতদের মধ্যে কমান্ডার ও কর্মকর্তারাও ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি অস্ত্রের গুদামে আগুন ধরে সেগুলোও ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করেছে হুতিরা। এসব দাবির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। গত সপ্তাহ থেকে সৌদি আরবের ওপর চাপ বাড়াতে তিনটি লক্ষ্য সামনে এনেছে হুতিরা।
প্রথমটি হলো ‘অবরোধের জবাবে অবরোধ’। এর মাধ্যমে সৌদি জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে আনসারুল্লাহ নামে পরিচিত হুতিদের ঘোষিত নৌ-নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো, যেখানে সৌদি সেনাদের সমাবেশ হবে, সেখানেই হামলা চালানো। তৃতীয় লক্ষ্য হলো ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং যেকোনো শত্রু বাহিনীর প্রবেশের বিরুদ্ধে লড়াই করা। আনসারুল্লাহর দাবি, তাদের নৌ-অভিযানের কারণে সৌদিদের ওপর কঠোর অবরোধ তৈরি হয়েছে। এমনকি সৌদি জাহাজের ক্ষেত্রে ‘একটি জাহাজও পার হতে পারবে না’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত আবার শুরু হওয়ার পর গত কয়েক সপ্তাহে সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কম্পানি আরামকোর বিভিন্ন স্থাপনায় অন্তত চারবার হামলা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এদিকে ইরানও সাম্প্রতিক সময়ে আরো প্রকাশ্যে হুতিদের সমর্থনে কথা বলছে। তেহরানের দাবি, ইয়েমেনে তাদের মিত্র হুতিরা পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর চাপ তৈরি করছে।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি এ সপ্তাহে ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা মেহর নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক বক্তব্যে সৌদি আরবের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, সৌদি আরবের সামরিক সক্ষমতা ইসরায়েলের তুলনায়ও কম। এই অবস্থায় দেশটি কীভাবে আনসারুল্লাহ ও ইয়েমেনি যোদ্ধাদের মোকাবেলা করবে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ইরান ও হুতিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, তারা তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এসব পথের মধ্যে হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব অন্যতম। লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে বাব আল-মান্দেব প্রণালি। এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ পরিচালিত হয়। আল মনিটরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের অবরোধের পরও বাব আল-মান্দেব দিয়ে জাহাজ চলাচল আবার বাড়তে পারে। সাম্প্রতিক উত্তেজনা বাড়ার আগে সাধারণত প্রতিদিন প্রায় ৫০টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করত।
তবে সরু এই সমুদ্রপথগুলোতে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সক্রিয় ছিল। হরমুজ প্রণালি দিয়ে ১২১টি জাহাজ চলাচল করেছে। এর আগের সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১১৮টি। অর্থাৎ জাহাজ চলাচল প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। পণ্যবাহী জাহাজও এই পথে চলাচল করেছে। তবে শুধু মোট জাহাজের সংখ্যা দিয়ে পরিস্থিতির পুরো চিত্র বোঝা যাচ্ছে না। কারণ, উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজ চলাচলের ধরনও বদলে গেছে। আল মনিটর জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলে বাধা তৈরি হওয়ায় সৌদি আরব লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানির পথ পরিবর্তন করছে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম