ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা কমিয়ে আবার আলোচনার পথ খুলতে তেহরান যাচ্ছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) তার এই সফর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সম্প্রতি ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর ঘোষণা দেয় ওয়াশিংটন। এরপর এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে।
ইরানের প্রতিবেশী এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র কাতার চলমান যুদ্ধে দুই পক্ষের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনায় মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করছে। গত জুনে যুদ্ধবিরতি কার্যকরে দেশটি সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল। ওই যুদ্ধবিরতির পর সাময়িকভাবে দুই পক্ষের লড়াই বন্ধ হয়েছিল।
যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস হতে চললেও কূটনৈতিক সমাধানের কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। লড়াই অনেকটাই থেমে থাকলেও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ এখনো কাটেনি। বিশ্বে তেল সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে ইরান চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সরু এই জলপথ নিয়ে মতবিরোধের কারণেই দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ভেঙে যায়। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
গত প্রায় এক মাসে ইরানে কোনো হামলার তথ্য দেয়নি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। লড়াই অনেকটাই বন্ধ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র এখন অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছে। নতুন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানকে তার বাণিজ্যিক অংশীদারদের থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা করেছে ওয়াশিংটন।
সর্বশেষ জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন কমে তিন মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। সোমবার এ পথে দিনে মাত্র ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এ প্রণালি দিয়ে যেত।
বুধবার ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) জানায়, হরমুজ প্রণালি ও সেখানকার আয়ের ভাগাভাগি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। তবে পরে ইরানের একজন ঊর্ধ্বতিন কর্মকর্তা জানান, চুক্তির বিস্তারিত বিষয় নিয়ে এখনো দুই দেশ আলোচনা করছে।
যুদ্ধের শুরুর দিকে আকাশপথে হামলায় ইরানের প্রচলিত সামরিক শক্তি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। এরপরও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকা দেশগুলোতে হামলা চালানো এবং হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার মতো যথেষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা তেহরানের রয়েছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে হরমুজ প্রণালিতে ৭০টি ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। এতে ১৯ জন নাবিক নিহত হয়েছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ঠেকানো, দেশটির জনগণকে সরকার পতনে সহায়তা করা এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংসের লক্ষ্য নিয়ে ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে ইরান ও লেবাননে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি বৃহস্পতিবার তেহরান সফরে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করবেন।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, সফরে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিয়েও আলোচনা হবে। ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরবেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে, 'উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনার উপযোগী পরিবেশ তৈরির উপায়' নিয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলবেন তিনি।
যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক এই জলপথে জাহাজ চলাচল ছিল অবাধ। তবে যুদ্ধের পর ইরান প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণকে চাপ প্রয়োগ ও আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করছে। জাহাজ চলাচলের জন্য ফি আদায়েরও চেষ্টা করছে তেহরান, যার বিরোধিতা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। 'চুক্তির বিস্তারিত বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে' বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে এ বক্তব্যের সঙ্গে আইআরজিসি'র মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বির বক্তব্যের কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। তিনি বলেছেন, প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও সেখানকার আয়ের ভাগাভাগি নিয়ে ইরান ও ওমান এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, 'যা দুই পক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য'।
মোহেব্বি বলেন, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো পূরণ না হলে হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে। ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশটির বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়া, ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে দফায় দফায় আলোচনা করছে ইরান ও ওমান। অন্যদিকে এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় তেহরান ও ওয়াশিংটন দুই পক্ষই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং পৃথকভাবে অবরোধ আরোপ করেছে।
রিপোর্টার্স২৪/এম এইচ