কালাই (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি: জয়পুরহাট সদর উপজেলার জিতারপুর এলাকার একটি আখক্ষেত থেকে কঙ্কাল উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর মোড় এসেছে। উদ্ধার হওয়া কঙ্কালটি ক্ষেতলাল উপজেলার হোপীরহাট এলাকার নিখোঁজ ব্যাটারিচালিত ভ্যানচালক ফরিদ হোসেন (৪০) এর বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় বুধবার (২৬ আগস্ট) নওগাঁর আত্রাই রেলস্টেশন এলাকা থেকে প্রধান আসামি সাগর হোসেন (২৫) নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। একই ঘটনার তদন্তে নেমে এর আগে জাকির হোসেন ও রবিউল ইসলাম নামে দুজনসহ মোট তিন আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃত তিনজনের মধ্যে সাগর হোসেন ও জাকির হোসেনের বাড়ি ক্ষেতলাল উপজেলার হোপীরহাট এলাকায়। অপর আসামি রবিউল ইসলামের বাড়ি জয়পুরহাট সদর উপজেলার পাকার মাথা এলাকায় বলে জানা গেছে।
জয়পুরহাট জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আরিফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, গত মঙ্গলবার জয়পুরহাট সদর থানা পুলিশ খবর পেয়ে একটি আখক্ষেত থেকে কঙ্কাল উদ্ধার করে। অন্যদিকে, ক্ষেতলাল থানায় করা একটি নিখোঁজ জিডি ও পরিবারের দাবির ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে প্রথমে জাকির হোসেন ও রবিউল ইসলাম নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ, বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এ ঘটনার সঙ্গে সাগর হোসেন নামে আরও একজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। পরে অভিযান চালিয়ে নওগাঁর আত্রাই থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত প্রধান আসামি সাগর ও পূর্বে গ্রেপ্তার হওয়া জাকির হোসেন তারা দুজনেই হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন।এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া রবিউল ইসলাম নামের আরেক আসামি চোরাই ভ্যানটি কেনার সঙ্গে জড়িত।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, সাগর ও জাকির তারা দুই বন্ধু মিলে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ডটি ঘটায়। প্রতিবন্ধী ভ্যানচালক ফরিদের ভ্যানটি চুরির উদ্দেশ্যে তাঁকে প্রথমে নির্জন স্থানে নিয়ে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দুর্বল করা হয়। পরে তাঁকে একটি আখক্ষেতের ভেতরে নিয়ে কাদামাটিতে চেপে ধরে হত্যা করে লাশ ফেলে রেখে যায় বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
ক্ষেতলাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুক্তারুল আলম বলেন, থানায় হওয়া জিডির সূত্র ধরে অভিযান চালিয়ে প্রথমে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়। এদিকে, সদর উপজেলার উদ্ধার হওয়া কঙ্কালের সঙ্গে থাকা পোশাক দেখে ফরিদের মা-বাবা সেটি তাঁদের ছেলের বলে শনাক্ত করেছিলেন। ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহের পর কঙ্কালটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় পলাতক প্রধান আসামি সাগরকে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার ও প্রাথমিকভাবে হত্যার রহস্য উদঘাটনে আমরা সক্ষম হই।
তিনি আরও বলেন, এ ঘটনার প্রধান আসামিকেও জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী (২৭ আগস্ট) বৃহস্পতিবার আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
থানা পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ আগস্ট বৃহস্পতিবার সকালে ক্ষেতলাল উপজেলার হোপীরহাট গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে প্রতিদিনের মতো ব্যাটারিচালিত ভ্যান নিয়ে বের হন ফরিদ হোসেন। এরপর থেকে তাঁর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে পরদিন তাঁর বাবা কুদ্দুস থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডির সূত্র ধরে সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গত সোমবার সদর উপজেলার পাকার মাথা এলাকার রবিউল ইসলামের গ্যারেজ থেকে ফরিদের ব্যাটারিচালিত অটোভ্যানটি উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় জাকির হোসেন ও রবিউল ইসলাম নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে, পরদিন মঙ্গলবার ভোরে সদর উপজেলার জিতারপুর মোড়ে একটি আখক্ষেত থেকে শিয়াল মানুষের হাড়গোড় সড়কের ওপর টেনে আনলে বিষয়টি নজরে আসে স্থানীয়দের।
পরে তাঁরা আখক্ষেতের ভেতরে গিয়ে একটি কঙ্কাল দেখতে পান। খবর পেয়ে সদর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কঙ্কালটি উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য জয়পুরহাট সদর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
কঙ্কাল উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান নিখোঁজ ফরিদ হোসেনের পরিবারের সদস্যরা। এ সময় কঙ্কালের সঙ্গে থাকা পোশাক দেখে তাঁরা সেটি ফরিদের বলে দাবি করেন।
কঙ্কালের ময়নাতদন্ত শেষে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নমুনা সংগ্রহের পর পুলিশ কঙ্কালটি ফরিদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। পরে ওই রাতেই পরিবারের সদস্যরা কঙ্কালটি দাফন করেন।
এ বিষয়ে ফরিদের বাবা আবদুল কুদ্দুস বলেন, আমার ছেলে ২০ আগস্ট সকালে অটোভ্যান নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি। আখক্ষেতে কঙ্কাল পাওয়ার খবর শুনে সেখানে গিয়ে পোশাক দেখে আমরা বুঝতে পারি, এটা আমার ছেলে ফরিদের লাশ। যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।
এদিকে, কঙ্কাল উদ্ধারের পর ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। তবে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত, গ্রেপ্তার ও হত্যার রহস্য উদঘাটনের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে এবং তারা পুলিশের এমন কাজের প্রশংসা করেছেন।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম