ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: ২০১০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) যখন আনুষ্ঠানিকভাবে আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর (এজেকে) শাখার যাত্রা শুরু করে, তখন সমাবেশে উপস্থিত খুব কম মানুষই মঞ্চের চারপাশে টাঙানো ব্যানার ও হোর্ডিংয়ে থাকা তরুণ ব্যক্তিটির মুখ চিনতেন।
তার ছবির নিচে স্পষ্ট করে লেখা ছিল নাম—ব্যারিস্টার সৈয়দ ইফতিখার আলি গিলানি।
পনেরো বছর পর—প্রভাবশালী পারিবারিক পরিচয়, অপ্রত্যাশিত নির্বাচনী সাফল্য, মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব, পরাজয়, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং শেষ পর্যন্ত ভাগ্যের অসাধারণ এক ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে—সেই তরুণ রাজনীতিকই এখন এজেকের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।
১৯৮০ সালের ২৭ জুলাই মুজাফফরাবাদে জন্ম নেওয়া গিলানি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন ইসলামাবাদে। পরে তিনি লন্ডনে যান এবং এসওএএস থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৫ সালে মর্যাদাপূর্ণ লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার হিসেবে সনদ লাভ করেন এবং পরের বছর ইসলামাবাদে আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধিত হন।
পারিবারিক পটভূমির কারণে রাজনীতি তার কাছে একেবারেই অপরিচিত ছিল না।
চার ভাইবোনের মধ্যে গিলানি সবার বড়। তিনি মূলত তার পিতামহীর কাছে বড় হয়েছেন। মুজাফফরাবাদে তার পিতামহী দাতব্য কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য পরিচিত ছিলেন। তার পিতামহ সৈয়দ বুনিয়াদ আলি শাহ গিলানি শহরের একজন পরিচিত ব্যবসায়ী ও পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তার বাবা সৈয়দ আসিফ আলি গিলানি ছিলেন প্রবীণ পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) নেতা রাজা মমতাজ হুসেইন রাথোরের বন্ধু। রাথোর ছিলেন বর্তমান বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ফয়সাল মমতাজ রাথোরের বাবা। সেই সম্পর্কের সূত্রেই আসিফ গিলানিও পিপিপিতে যোগ দিয়েছিলেন। তবে ছেলে সক্রিয় রাজনীতিতে আসার আগেই তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান।
অপ্রত্যাশিত জয়
২০১১ সালের নির্বাচনে তৎকালীন পিএমএল-এন আঞ্চলিক সভাপতি রাজা ফারুক হায়দার মুজাফফরাবাদ ও চিকর—দুই আসন থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে উভয়টিতেই জয়ী হন।
পরে তিনি চিকর আসনটি রেখে মুজাফফরাবাদ আসনটি ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পিএমএল-এনের অনেক নেতাই অনাগ্রহ দেখান। প্রচলিত ধারণা ছিল, শহরটি বিরোধী দলের কোনো প্রার্থীকে নির্বাচিত করবে না।
অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলও স্থানীয় কোনো দলীয় নেতাকে প্রার্থী না করে মুসলিম কনফারেন্সের সভাপতি ও সাবেক এজেকে প্রধানমন্ত্রী সরদার আতীক আহমেদ খানের ছেলে সরদার উসমান আতীককে মনোনয়ন দেয়।
একজন ‘বহিরাগত’কে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এতে নির্বাচনী এলাকায় স্থানীয় বনাম বহিরাগত—এই মনোভাব জোরালো হয়, যা শেষ পর্যন্ত তরুণ গিলানির পক্ষে যায়। তিনি স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ব্যবধানে উপনির্বাচনে জয়ী হন।
এরপর তাকে প্রধানমন্ত্রীর যুব ব্যবসায়িক ঋণ কর্মসূচির ফোকাল পারসন ও সমন্বয়কারী করা হয়। সেখানে তিনি পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ পান। ২০১৩ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে পিএমএল-এনের কেন্দ্রীয় ইশতেহার কমিটিরও সদস্য ছিলেন তিনি।
২০১৬ সালের এজেকে নির্বাচনে গিলানি তার আসন ধরে রাখেন। ওই নির্বাচনে পিএমএল-এন এজেকে ব্যাপক বিজয় অর্জন করে এবং গিলানিকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করে উচ্চ ও স্কুলশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে মন্ত্রণালয়টি ভাগ করে উচ্চশিক্ষার দায়িত্ব অন্য একজন মন্ত্রীর কাছে দেওয়া হলেও গিলানি পুরো পাঁচ বছরই মন্ত্রিসভায় ছিলেন।
তবে ২০২১ সালে তার রাজনৈতিক ভাগ্য নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ওই নির্বাচনে পিএমএল-এন বড় ধাক্কা খেয়ে মাত্র চারটি আঞ্চলিক আসনে জয় পায়। গিলানিও নিজের আসনে পরাজিত হন। তার রাজনৈতিক উত্থান যে এতদিন মসৃণভাবে এগিয়ে চলেছিল, সেই ধারায় এই পরাজয় সাময়িকভাবে ছেদ টানে।
অপ্রত্যাশিত পছন্দ
সাম্প্রতিক এজেকে নির্বাচনের আগে এমন কোনো ইঙ্গিত ছিল না যে গিলানির রাজনৈতিক ভাগ্য আবার ঘুরে দাঁড়াতে চলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজা ফারুক হায়দার তার ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধু ও সহযোগীও তাকে সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানান। অন্যান্য কারণের সঙ্গে এসব বিষয়ও তার সাধারণ নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে ভূমিকা রাখে।
তবে পিএমএল-এনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাকে আবারও টেকনোক্র্যাট ও অন্যান্য পেশাজীবীদের জন্য সংরক্ষিত আসনগুলোর একটির জন্য বিবেচনা করে। ধারণা করা হয়েছিল, তিনি হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবেন। কিন্তু হঠাৎ করেই তার নাম এজেকের প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আসতে শুরু করে।
পিএমএল-এনের আঞ্চলিক সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী তারিক ফারুককে যখন স্পিকার পদে মনোনীত করা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হচ্ছিল যে আঞ্চলিক দলীয় সভাপতি শাহ গুলাম কাদিরই এজেকের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
কিন্তু বুধবার রাতে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ স্পিকার তারিক ফারুক, ডেপুটি স্পিকার আহমেদ রাজা কাদরি, শাহ গুলাম কাদির এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজা ফারুক হায়দারকে বৈঠকে ডাকেন। সেখানে তিনি পিএমএল-এন সুপ্রিমো নওয়াজ শরিফের সিদ্ধান্ত জানান—গিলানিই হবেন এজেকের প্রধানমন্ত্রী পদে দলের প্রার্থী।
আঞ্চলিক দলীয় কাঠামোর সবাই অবশ্য এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাননি। হায়দার ও কাদির এর বিরোধিতা করেন এবং জানান, তারা নির্বাচনে ভোটদান থেকে বিরত থাকবেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিধানসভার স্পিকার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের সময়সূচি বৃহস্পতিবার থেকে পিছিয়ে শুক্রবার করেন।
৪৬ বছর বয়সে গিলানি এখন এজেকের সর্বোচ্চ নির্বাচিত পদে বসতে চলেছেন—মাত্র পাঁচ বছর আগে যে বিধানসভা আসনে পরাজিত হয়েছিলেন, সেই পরাজয়কেই অনেকে হয়তো তার রাজনৈতিক উত্থানের সমাপ্তি বলে ধরে নিয়েছিলেন।
২০১০ সালের পিএমএল-এনের প্যানফ্লেক্সে হাস্যোজ্জ্বল মুখের তরুণ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত গিলানির যাত্রা কেবল রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রচলিত গল্প নয়। এটি সময় ও পরিস্থিতিরও গল্প—একটি অপ্রত্যাশিত উপনির্বাচনী জয়, মন্ত্রিসভায় প্রবেশ, দুটি নির্বাচনী পরাজয়, সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে প্রত্যাবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত।
এই অর্থে, গিলানির রাজনৈতিক ক্যারিয়ার যেমন অধ্যবসায়ের ফল, তেমনি এর পেছনে কাজ করেছে অসাধারণ সৌভাগ্যও।
সূত্র: ডন
রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ