সিনিয়র রিপোর্টার: চুক্তি পরবর্তী কোনো বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য চুক্তিতে শালিস বা আর্বিট্রেশনের সুযোগ থাকলে, তা অনুসরণ না করে সরাসরি হাইকোর্টে রিট আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় বলে অভিমত দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত।
সমঝোতা বা আলোচনার মাধ্যমে চুক্তিনামা সম্পাদনের প্রক্রিয়া নিয়ে আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে এক সিভিল রিভিশন খারিজ করে দেওয়া রায়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন।
আদালত রায়ে উল্লেখ করেছেন- সমঝোতা চুক্তিতে আইন দ্বারা নির্ধারিত কোন বিকল্প ও কার্যকর প্রতিকার বিদ্যমান থাকলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে সরাসরি রিট এখতিয়ার প্রয়োগের সুযোগ নেই।
মেসার্স এএমএস ফারাজ কনস্ট্রাকশন বনাম রাষ্ট্র মামলায় আপিল বিভাগ এমন যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত আপিল বিভাগের দেওয়া ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি গত ২৫ আগষ্ট প্রকাশিত হয়েছে। রায় দেওয়া অন্য চার বিচারপতি হলেন- বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস.এম. এমদাদুল হক, বিচারপতি এ.কে.এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া ৩৭ পৃষ্ঠার ওই রায়টি লিখেছেন বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
রায় ঘোষণাকালে আদালতে আবেদনের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, প্রবীর নিয়োগী, ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিক, ব্যারিস্টার নওশাদ জমির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রেজা মো. সাদেকীন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. ওবায়দুর রহমান (তারেক)।
রায়ে বলা হয়েছে, সরকারি সম্পদ বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো চুক্তির ক্ষেত্রে সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ জড়িত থাকলেও, চুক্তির নির্ধারিত শর্ত ভঙ্গকারী পক্ষ রিট আবেদন করে প্রতিকার দাবি করতে পারে না। বিশেষ করে, চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর শালিস বা আর্বিট্রেশনের ব্যবস্থা থাকলে, সেই বিকল্প প্রতিকার গ্রহণ না করে সরাসরি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট আবেদন করে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ নেই।
মামলার পটভূমি:
কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার দৌলতপুর এলাকায় প্রায় ১৬ একক জমির ওপর ১৯৬৬ সালে ‘চিশতী টেক্সটাইল মিলস’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে ১৯৭২ সালে মিলটি জাতীয়করণ করা হয়।
এরপর ১৯৯৮ সালে কারখানার উৎপাদন বন্ধ করে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে শ্রমিকদের বিদায় করে দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে অবশ্য বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি) পুনরায় কারখানাটিতে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু অবিরত লোকসানের মুখে ১৯৯৮ সালে মিলটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০০৩ সালের ৯ নভেম্বর এটি অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এ বস্ত্রকলটি বিক্রির জন্য লিকুইডেটর (অবসায়ক) নিয়োগ করার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার গঙ্গানগরের এএমএস ফারাজ কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মো. ফারুক ইসলাম ভূঁইয়া এই বস্ত্রকলটি কেনার জন্য আগ্রহ দেখায়। পরবর্তীতে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় মিলটির মূল্য ৩৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করে এবং প্রথম পর্যায়ে ১৫ কোটি টাকা ডাউন পেমেন্ট গ্রহণ সাপেক্ষে বাকি ২০ কোটি টাকা পাঁচটি সমান কিস্তিতে পরিশোধের শর্তে ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি চুক্তিপত্র সম্পাদন করে। এবং ২০১৪ সালের ৯ জানুয়ারি জায়গাসহ মিলটি এএমএস ফারাজ কনস্ট্রাকশনকে দখল হস্তান্তর করে দেয় সরকার।
কিন্তু দরপত্র আহ্বান বা উন্মুক্ত নিলাম ছাড়াই কারখানাটি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এবং মিলটির অবসায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে ২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কয়েকটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এসব সংবাদ মাধ্যমে- আইন ও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সাড়ে তিনশ কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি মাত্র ৩৫ কোটি টাকায় বিক্রয়ের অভিযোগ আনা হয়। এ ছাড়া মিলটি বিক্রি করার প্রক্রিয়া নিয়েও সে সময় সংবাদ মাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে।
এরপর সরকার মিল সম্পর্কিত যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা থেকে বিরত থাকতে মিল ক্রয়কারী ফারুক ইসলাম ভূঁইয়াকে নির্দেশ দিয়ে অফিস আদেশ জারি করে। পাশাপাশি মিলের ক্রয় বাবদ বকেয়া কিস্তি গ্রহণ বন্ধ করে দেয় সরকার। যদিও ফারাজ কনস্ট্রাকশন দ্বিতীয় কিস্তি পরিশোধের সময় থেকেই অনিয়মিত হয়ে পড়ে।
এরপর ওই আদেশ প্রত্যাহার চেয়ে ফারাজ কনস্ট্রাকশন আবেদন করলে তা গ্রহণ প্রত্যাখ্যান করে সরকার। এবং এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করে ২০১৪ সালের ১৭ এপ্রিল পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত মিলের যাবতীয় কার্যক্রম স্থগিত করে এক আদেশ জারি করে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি)।
পরে বিটিএমসির ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার চেয়ে আবেদন করে ফারাজ কনস্ট্রাকশন। আবেদনে সাড়া পেয়ে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। এতেও সাড়া না পেয়ে ২০১৪ সালে এএমএস ফারাজ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড হাইকোর্টে রিট দায়ের করে। ওই রিটের শুনানি নিয়ে রুল জারি করে আদালত।
এরপর উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ১৫ জুন কয়েকটি নির্দেশনা দিয়ে রুল নিষ্পত্তি করে রায় দেন হাইকোর্ট।
রায়ে হাইকোর্ট বিবাদীদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে বলেন, চিশতি টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডে ফারাজ কনস্ট্রাকশন যেন তার কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার অনুমতি প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হলো। এবং সরকার যেন ফারাজ কনস্ট্রাকশনের কাছ থেকে পাওনা অবশিষ্ট অর্থের কিস্তি গ্রহণ করেন এমন নির্দেশনাও দেওয়া হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) সঙ্গে ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি সম্পাদিত বিক্রয় চুক্তিনামার শর্তাবলী মেনে আইন অনুযায়ী ফারাজ কনস্ট্রাকশনের অনুকূলে প্রয়োজনীয় বিক্রয় দলিল সম্পাদন ও নিবন্ধন করে দেওয়ার নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট।
পরে হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে সরকার। ২০১৮ সালের ৩ জুলাই হাইকোর্টের দেওয়া রায় ও আদেশ বাতিল করে দেন আপিল বিভাগ। এরপর ২০১৯ সালে ফারাজ কনস্ট্রাকশন আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে সিভিল রিভিউ আবেদন করেন। যা ২০২৫ সালের ৬ মার্চ সিভিল রিভিউ হিসেবে শুনানির জন্য গ্রহণ করেন আদালত। এরপর ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সিভিল রিভিউ আবেদনটি খারিজ করে রায় দেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির আপিল বিভাগ।
রায়ে যা বলেছেন সর্বোচ্চ আদালত:
সমঝোতামূলক চুক্তিনামায় দরপত্র বা উন্মুক্ত নিলাম ব্যতীত অন্য কোনোভাবে মিলটি বিক্রি করার কোনো ক্ষমতা অবসায়ককে দেওয়া হয়নি। তাই এটা স্পষ্ট যে, চুক্তি হওয়ার পর উক্ত চুক্তিনামায় উল্লিখিত বিধানের অধীনে নির্ধারিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে মিলটি হস্তান্তর করা যাবে না। এটা আরও স্পষ্ট যে, চুক্তির অধীনে মিল হস্তান্তরের পদ্ধতিটি আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। ফলে আইনত বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া এড়িয়ে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে অবসায়কের ক্ষমতা প্রয়োগ করা আদালতের আদেশের সুস্পষ্ট নির্দেশাবলীরও পরিপন্থী।
সুতরাং উপরোক্ত পরিস্থিতিতে আপিলকারীদের আচরণই প্রমাণ করে যে, তারাই চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও বিধান লঙ্ঘন করেছেন। অতএব, নিজেদের কথিত চুক্তি অনুসরণ করার দাবির ভিত্তিতে বর্তমান রিটে তাদের কোনো আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নেই।
রায়ে আরও বলা হয়, যেখানে পক্ষগণ চুক্তি থেকে উদ্ভূত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সালিশকেই (আর্বিট্রেশন) নিজেদের পছন্দের ফোরাম হিসেবে নির্ধারণ করেছে, সেখানে আপিলকারী সেই বিধি সম্মত কৌশলকে এড়িয়ে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে সরাসরি চুক্তির শর্তাবলী বাস্তবায়নের জন্য আবেদন করতে পারে না।
এই প্রসঙ্গে এই বিভাগের (আপিল বিভাগ) অভিমত হলো—যেখানে চুক্তি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থেকে বিরোধের সৃষ্টি হয় এবং চুক্তিনামাতেই সালিশ বা অন্য কোনো বিধি সম্মত ফোরামের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকে, সেখানে সংক্ষুব্ধ পক্ষের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগের ব্যতিক্রমী এখতিয়ার প্রয়োগ না করে চুক্তি নির্ধারিত প্রতিকারের পথই অনুসরণ করা উচিত।
চূড়ান্ত আদেশ ও নির্দেশনা:
আদালত বলেছেন, চুক্তিনামা অনুযায়ী আপিলকারী অর্থ পরিশোধের সময়সূচি মেনে চলতে ব্যর্থতা হওয়া, চুক্তিনামায় অন্তর্ভুক্ত থাকা সালিশি বা আর্বিট্রেশনের ধারাটি প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হওয়া এবং পর্যালোচিত রায়ে সুস্পষ্ট ত্রুটি অনুপস্থিতি থাকায় আমরা আপিল বিভাগের রায় ও আদেশে হস্তক্ষেপ করার মতো কোন সারবত্তা অত্র সিভিল আপিলটিতে খুঁজে পাইনি। অতএব অত্র সিভিল আপিলটি খারিজ করা হলো।
রিপোর্টার্স২৪/এআইএম/ধ্রুব