আশিস গুপ্ত, নয়াদিল্লি: মহাদেশগুলোর স্থলভাগের "আরও নির্ভুল উপস্থাপনা" নিশ্চিত করতে বিশ্বের এক নতুন মানচিত্র গ্রহণের পক্ষে প্রস্তাব পাস করেছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। নতুন এই মানচিত্রে আফ্রিকা মহাদেশের আয়তন আগের চেয়ে বড় এবং উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের আয়তন ছোট হয়ে দেখা যাবে। তবে জাতিসংঘের এই পদক্ষেপে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন।
শুক্রবার গৃহীত এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে ১৬৪টি দেশ। একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর বিপক্ষে ভোট প্রদান করে এবং ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। জাতিসংঘের প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, 'ইকুয়াল আর্থ' নামের এই নতুন মানচিত্রটি "বিশ্বের ভৌগোলিক উপস্থাপনার সঠিকতা বহুগুণ বৃদ্ধি করবে"। একইসঙ্গে ঐতিহ্যবাহী 'মেরকেটর প্রজেকশন'-এর পরিবর্তে সব সদস্য রাষ্ট্রকে নতুন এই মানচিত্র ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
১৫৬৯ সালে ফ্লেমিশ মানচিত্রকর জেরার্ডাস মেরকেটর সমুদ্রযাত্রায় দিকনির্ণয়ের সুবিধার জন্য এই পুরনো মানচিত্রের নকশা তৈরি করেছিলেন। প্রস্তাব উত্থাপনকারী দেশ টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ডুসে বলেন, মানচিত্র শিক্ষার গতিপথ নির্দেশ করে, কল্পনাশক্তিকে সমৃদ্ধ করে এবং মানুষের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। ফলে মানচিত্র কখনোই নিরপেক্ষ নয়। যখন কোনো মানচিত্রে পৃথিবীর বিকৃত ছবি তুলে ধরা হয়, তখন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভুল ধারণা স্থায়ী রূপ নেওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। তবে এই প্রস্তাবের তীব্র
সমালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এ ধরনের অপ্রয়োজনীয় পদক্ষেপের কারণেই জাতিসংঘ তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। ভোটাভুটির আগে জাতিসংঘে মার্কিন প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনসেভিচ বলেন, প্রকৃত বৈশ্বিক সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা না করে এই সংস্থা ষোড়শ শতকের মানচিত্র প্রকল্প এবং 'জ্ঞানভিত্তিক বিচার' নিশ্চিত করার মতো তাত্ত্বিক আলোচনায় সময় নষ্ট করছে।
ষোড়শ শতকের মেরকেটর মানচিত্রে স্থলভাগের আকৃতি ও কোণ সঠিকভাবে দেখানো হলেও মহাদেশগুলোর তুলনামূলক আয়তন ছিল বেশ ত্রুটিপূর্ণ। ত্রিমাত্রিক গোলককে দ্বিমাত্রিক মানচিত্রে রূপান্তরের চ্যালেঞ্জের কারণে মেরকেটর মানচিত্রে মেরু অঞ্চলের উত্তরের দেশগুলোকে অতিরিক্ত বড় এবং বিষুবরেখার কাছের অঞ্চলগুলোকে সংকুচিত করে দেখানো হতো। ফলে বাস্তবে ছোট হওয়া সত্ত্বেও ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাকে বিশাল দেখাত এবং আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার প্রকৃত আয়তন ছোট হয়ে যেত।
২০১৮ সালে একদল মানচিত্রকর 'ইকুয়াল আর্থ' নকশাটি তৈরি করেন। এতে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং ওশেনিয়ার আয়তন তাদের প্রকৃত আকারের অনুপাতে বেশ বড় ও সঠিক দেখায়। ২০১৫ সালে এই মানচিত্রের অন্যতম রূপকার বোজান সাভরিক জানান, ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন মহাদেশগুলোর প্রকৃত আয়তনের অনুপাত বজায় রাখে এবং যতটা সম্ভব গোলকের সঠিক আকৃতি ফুটিয়ে তোলে।
নতুন এই প্রস্তাবের সহ-উদ্যোক্তা ফ্রান্স ইতোমধ্যেই মেরকেটর মানচিত্র ব্যবহার বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল বারোট বলেন, পুরনো মানচিত্রে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তুলনায় আমেরিকা, রাশিয়া ও চীনকে অনুপাতের বাইরে অতিরিক্ত বড় দেখানো হতো। এমনকি গ্রিনল্যান্ডকে প্রায় সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশের সমান বড় দেখাত। মানচিত্র পাল্টালেই রাতারাতি পৃথিবী বদলে যাবে না স্বীকার করেও তিনি বলেন, বিকৃত ছবিকে সংশোধন করাটাও সত্য প্রতিষ্ঠারই একটি অংশ। মূলত সাবেক আফ্রিকান উপনিবেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠন ও সুসংহত করার প্রয়াস হিসেবেই ফরাসি সরকারের এই পদক্ষেপকে দেখা হচ্ছে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম