নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ানো, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ইইউর পক্ষ থেকে উত্থাপিত অশুল্ক বাধা দূর করার কৌশল নির্ধারণে ইইউ রাষ্ট্রদূত ও হেড অব ডেলিগেশনসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে বসছে সরকারের মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও একাধিক প্রতিমন্ত্রী।
আজ রোববার সচিবালয়ে অনুষ্ঠেয় এ বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বৈঠকে আরও অংশ নেবেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটির চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন মোট ৫২টি অশুল্ক বাধা চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে সরকার ইতোমধ্যে ৪০টি সমাধান করেছে এবং বাকি ১২টি বাধা দূর করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কাজ করছে।
বৈঠকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পরও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সুবিধা ধরে রাখা, বাণিজ্য বাধা দূর করা এবং ইইউ সদস্য দেশগুলো থেকে আরও বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়েও আলোচনা হবে।
লজিস্টিকস খাতে শতভাগ বিদেশি মালিকানায় বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে ইইউ। এ সুবিধা চালু করতে ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের জাহাজ চলাচল আইনে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ পণ্য পরিবহনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে ইইউ।
বৃহৎ রপ্তানিকারকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আইন সংশোধন করে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজে ৫০ শতাংশ পণ্য পরিবহনের বাধ্যবাধকতা শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি জাহাজের আবেদন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিষ্পত্তি করছে সরকার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ইইউ যেসব অশুল্ক বাধা দূর করার কথা বলেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কাস্টমসে দীর্ঘসূত্রিতা এবং প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসিংয়ের সীমিত ব্যবহার।
এ ছাড়া বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে ম্যানুয়াল চেকিং বা স্ক্যানিং ব্যবস্থার কারণে পণ্য খালাসে দেরি হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেছে ইইউ এবং এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে অনুরোধ করেছে।
এ সমস্যা সমাধানে কাস্টমস ও বন্দরের মধ্যে ডিজিটাল সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো চালু হওয়ায় পণ্য খালাসে সমন্বয়হীনতা ও অনিয়ম কমছে বলে মনে করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
ওষুধ, স্বাস্থ্য ও সরকারি ক্রয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করার সুপারিশও করেছে ইইউ। বাংলাদেশ বলছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউরোপিয়ান মেডিসিনস এজেন্সি (ইএমএ) কিংবা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ নির্ধারিত উন্নত দেশের সনদ থাকলে বাংলাদেশে ওষুধ নিবন্ধন করা হচ্ছে।
এ ছাড়া সংবেদনশীল ওষুধ দ্রুত সংরক্ষণের জন্য বন্দরে প্লাগ-ইন ব্যবস্থা সক্রিয় রাখা হয়েছে এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য খসড়া স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) তৈরি করা হয়েছে।
বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে বেশ কিছু অশুল্ক বাধার কথা উল্লেখ করে আসছে এবং সেগুলোর সমাধান চাইছে।
বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর থেকে ছাড়পত্র ও অনুমোদন পাওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর ও জটিল বলে মনে করে ইইউ। তারা এটিকে ব্যবসা ও বিনিয়োগের অন্যতম বাধা হিসেবে দেখছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ব্যবসা শুরুর জটিলতা কমাতে বাংলাবিজ এবং ওয়ানস্টপ সার্ভিস বা ওএসএস পোর্টাল চালু করা হয়েছে। এর ফলে এক মাসেরও কম সময়ে প্রাথমিক লাইসেন্স পাওয়া সম্ভব হবে।
ইইউ নাগরিকদের জন্য প্রাইভেট ইনভেস্টর ক্যাটাগরি বা 'পি' ক্যাটাগরি এবং কর্মসংস্থান, নিয়োগ বা বিশেষজ্ঞ কাজের সঙ্গে যুক্তদের জন্য 'ই' ক্যাটাগরির ভিসা এককালীন সর্বোচ্চ দুই বছরের জন্য দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতিবছর নবায়নের শর্তও তুলে নেওয়া হয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/এম এইচ