বাগেরহাট প্রতিনিধি: মেয়ের বয়স মাত্র ১৪ বছর। তিন মাস আগে স্কুলে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হওয়ার পর আজও তার কোনো সন্ধান পাননি বাবা পি এম রাজুল ইসলাম। মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আশায় প্রথমে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি), পরে মামলা এবং সর্বশেষ বাগেরহাটের পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন তিনি। কিন্তু এত কিছুর পরও মেয়ের সন্ধান না পাওয়ায় একদিকে পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, অন্যদিকে জীবিকার তাগিদে স্কুলের চাকরিও করতে হচ্ছে তাকে।
নিখোঁজ রাফিয়া তুজ আথেরা বাগেরহাট সদর উপজেলার চিরুলিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের নিয়মিত ছাত্রী। তার শ্রেণি রোল নম্বর ৬।পরিবারের দাবি, গত ৩ জুন সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে প্রতিদিনের মতো স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয় রাফিয়া। বাগেরহাট সদর উপজেলার ৪ নং বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের কু-বিষ্ণুপুর এলাকা থেকে তাকে অপহরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের।
চিরুলিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পি এম রাজুল ইসলাম বলেন, আমার মেয়ের বয়স মাত্র ১৪ বছর। তিন মাস হয়ে গেল, এখনো জানি না আমার মেয়েটা কোথায় আছে, কেমন আছে। প্রথমে জিডি করেছি, পরে মামলা করেছি, পুলিশ সুপারের কাছেও আবেদন করেছি। তারপরও মেয়েকে ফিরে পাইনি। স্কুলের কাজের ফাঁকে ফাঁকে মেয়ের সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় ছুটে বেড়াই। কোথাও কোনো খবর পেলেই মনে হয়, হয়তো এবার মেয়েকে ফিরে পাব।
তিনি আরও বলেন, মেয়েটা স্কুলে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। সেই যে বের হলো, আর ফিরে এলো না। প্রতিদিন মনে হয়, এই বুঝি দরজায় এসে দাঁড়াবে। রাতে ঘুমাতে গেলেও চিন্তা হয়মে য়েটা কোথায় আছে, কেমন আছে। একজন বাবা হিসেবে আমি শুধু আমার মেয়েকে জীবিত ও নিরাপদ অবস্থায় ফিরে পেতে চাই। আমি কারও প্রতি অন্যায় চাই না। শুধু চাই, আমার মেয়ের সঙ্গে কী ঘটেছে তা তদন্ত করে বের করা হোক এবং যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।
এজাহারে পি এম রাজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ঘটনার আগে থেকেই আরমান সরদার তার মেয়েকে প্রেমের প্রলোভনসহ বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করে আসছিলেন। গত ৩ জুন সকালে রাফিয়া স্কুলে যাওয়ার পথে কু-বিষ্ণুপুর এলাকায় পৌঁছালে আরমান তাকে ভুল বুঝিয়ে নিয়ে যান বলেও এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
মেয়ে বাড়িতে ফিরে না আসায় পরদিন ৪ জুন বাগেরহাট সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন রাজুল ইসলাম। জিডি নম্বর ২২১। পরে মেয়ের কোনো সন্ধান না পেয়ে গত ৬ জুলাই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭/৩০ ধারায় মামলা করেন তিনি। মামলার নম্বর ১০, বার্ষিক নম্বর ২২৪।
মামলা করার পরও মেয়ের সন্ধান না পাওয়ায় গত ১৭ আগস্ট বাগেরহাটের পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করেন রাজুল ইসলাম। আবেদনে জিডি ও মামলা করার পরও মেয়েকে উদ্ধারে কাঙ্ক্ষিত তৎপরতা না পাওয়ার অভিযোগ তুলে দ্রুত উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারে আরমান সরদার (১৯), তার বাবা কামরুল সরদার (৪৬) এবং কামরুল সরদারের স্ত্রী লাবনী আক্তার (৩৭)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও দুই থেকে তিনজনকে আসামি করা হয়েছে।
চিরুলিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. আনোয়ার হোসেন পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া আবেদনে বিষয়টি সহৃদয়তার সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছেন বলে আবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
মেয়েকে হারানোর পর থেকে প্রতিটি দিনই যেন অপেক্ষার প্রহর গুনছেন রাজুল ইসলাম ও তার পরিবার। স্কুলের চাকরি করে সংসারের দায়িত্ব সামলালেও কাজের ফাঁকে ফাঁকে মেয়ের সন্ধানে ছুটে বেড়ান তিনি। কোথাও কোনো খবর পাওয়ার আশায় বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নেন। তিন মাস পেরিয়ে গেলেও মেয়ের সন্ধান না পাওয়ায় উদাসীনতাই দিন কাটছে পুরো পরিবারের।
এ বিষয়ে বাগেরহাট সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ সামসুল আরেফিন বলেন,মামলার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। নিখোঁজ কিশোরীকে উদ্ধারে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তদন্তের মাধ্যমে তার অবস্থান শনাক্ত করে তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
পরিবারের দাবি, ১৪ বছরের একজন স্কুলছাত্রী তিন মাস ধরে নিখোঁজ থাকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দ্রুত তাকে উদ্ধার করা হোক। মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আশায় এখনো পথ চেয়ে দিন কাটছে তার বাবা-মায়ের। তাদের একটাই প্রত্যাশা—রাফিয়া যেন জীবিত ও নিরাপদ অবস্থায় দ্রুত পরিবারের কাছে ফিরে আসে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম