আশিস গুপ্ত, নয়াদিল্লি: ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং সংঘাত ঘিরে দেখা দেওয়া তীব্র মতপার্থক্য নিরসন করে শেষ পর্যন্ত একমত হতে পেরেছেন ব্রিকস রাষ্ট্রগোষ্ঠীর নেতারা। দীর্ঘ ও জটিল আলোচনার পর গৃহীত হয়েছে যৌথ ঘোষণা, যাকে ভারতের জন্য একটি বড় ধরণের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সম্মেলন শেষে নিজের বক্তব্যের সমাপনীতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন যে, ঐতিহাসিক ‘নয়াদিল্লি ডিক্লারেশন’ বা যৌথ ঘোষণা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। বিশ্বমঞ্চে পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী জানান, আজকের আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে পৃথিবী পাল্টাচ্ছে এবং আমাদের পুরনো চিন্তাভাবনায় বন্দি থাকলে চলবে না।
তিনি আরও বলেন যে প্রতিনিধিত্ব, সংবেদনশীলতা এবং নিয়ম তৈরি—এই তিনটি বিষয়ই সমানভাবে জরুরি এবং উদীয়মান প্রযুক্তির নিয়মকানুন নির্ধারণে গ্লোবাল সাউথের সমান অংশীদারিত্ব থাকা প্রয়োজন। ইরান যুদ্ধের প্ররিপ্রেক্ষিতে ব্রিকস ভুক্ত দেশগুলির মধ্যে খসড়া ঘোষণার ভাষা নিয়ে রাতভর টানাপোড়েন চলে, যেখানে ভারত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করে। বিশেষ করে ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা এবং পরবর্তীতে মার্কিন ঘাঁটি পরিচালনাকারী উপসাগরীয় দেশগুলিতে ইরানের পাল্টা হামলা নিয়ে ব্রিকসের দুই সদস্য দেশ ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মধ্যে মতপার্থক্য চরমে পৌঁছায়।
এর আগে মে মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকসহ একাধিক প্রশাসনিক স্তরে এই বিরোধের কারণে কোনো যৌথ ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি এবং ভারতকে কেবল ‘চেয়ারম্যানস স্টেটমেন্ট’ প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হতে হয়েছিল। ফলে নয়া দিল্লির এই শীর্ষ সম্মেলনে যৌথ ঘোষণা আনা ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতার বড় পরীক্ষা ছিল। রাজনৈতিকভাবেও এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিরোধী দল কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিল যে ভারত সরকার ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে।
সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের হাত ধরে হাঁটতে দেখা যায়, যেখানে তাঁদের সাথে ছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা। এই নয়া দিল্লি ঘোষণাপত্রে শুধু মধ্যপ্রাচ্য সংকটই নয়, ভারতের নিরাপত্তার বিষয়টিও স্থান পেয়েছে। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে এই যৌথ ঘোষণায়, যে ঘটনায় ২৬ জন সাধারণ মানুষের প্রাণ গিয়েছিল এবং বহু মানুষ আহত হয়েছিলেন। সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং নিরাপদ আশ্রয়স্থলের বিরুদ্ধে শূন্য-সহনশীলতা নীতি বজায় রাখার বার্তা দিয়ে ব্রিকস নেতারা দ্বিমুখী নীতি বর্জন করার আহ্বান জানান। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো ব্রিকসের যৌথ মঞ্চ থেকে পহেলগাম হামলার এই কড়া নিন্দা ও বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদ দমনে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের বার্তা ভারতকে কূটনৈতিকভাবে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল।
নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, আমরা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী একতরফা বলপ্রয়োগকারী পদক্ষেপ বা অবরোধ আরোপের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং পুনর্ব্যক্ত করছি যে এই ধরনের পদক্ষেপ—বিশেষ করে একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং গৌণ নিষেধাজ্ঞার রূপে—লক্ষ্যবস্তু হওয়া দেশগুলোর সাধারণ মানুষের উন্নয়ন, স্বাস্থ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তার অধিকারসহ মানবাধিকারের ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মানুষকে অসমভাবে প্রভাবিত করে, ডিজিটাল বিভাজনকে গভীর করে এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জকে তীব্র করে তোলে। আমরা এই ধরনের বেআইনি পদক্ষেপগুলো বিলুপ্ত করার আহ্বান জানাই, যা আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রসংঘ সনদের নীতি ও উদ্দেশ্যকে ক্ষুণ্ণ করে। আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রসংঘের সনদের পরিপন্থী যেকোনো একতরফা দমনমূলক ব্যবস্থা, যার মধ্যে রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক অননুমোদিত নিষেধাজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত, তার বিরুদ্ধে আমাদের বিরোধিতা আমরা পুনরায় নিশ্চিত করছি।
৪৫ দফা সংবলিত ঘোষণাপত্রে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা সম্পর্কে বলা হয়েছে, আমরা মেরুকরণ ও অবিশ্বাসের বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট লক্ষ্য করছি এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদার করতে বৈশ্বিক পদক্ষেপকে উৎসাহিত করছি। সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে রাজনৈতিক-কূটনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এই সমস্ত চ্যালেঞ্জ এবং তৎসংক্রান্ত নিরাপত্তা হুমকির জবাব দিতে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি এবং সংঘাতের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছি।
আমরা জোর দিয়ে বলছি যে সকল দেশের নিরাপত্তা অবিচ্ছেদ্য এবং সংলাপ, পরামর্শ ও কূটনীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির প্রতি আমাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছি। সংঘাত প্রতিরোধ ও নিষ্পত্তিতে আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর সক্রিয় ভূমিকা পালনকে আমরা উৎসাহিত করি এবং সংকট সমাধানের উদ্দেশ্যে পরিচালিত সকল শান্তিপূর্ণ প্রচেষ্টাকে সমর্থন করি। আন্তর্জাতিক বিরোধের ক্ষেত্রে, রাষ্ট্রসংঘের সনদের উদ্দেশ্য ও নীতি অনুযায়ী, সংকট এড়ানো এবং পরিস্থিতির অবনতি রোধ করার জন্য প্রাসঙ্গিক পক্ষগুলোর সম্মতিক্রমে প্রতিরোধমূলক কূটনীতি ও মধ্যস্থতার গুরুত্ব আমরা তুলে ধরছি। এই বিষয়ে, আমরা সশস্ত্র সংঘাত প্রতিরোধ, রাষ্ট্রসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন, আফ্রিকান ইউনিয়নের শান্তি সহায়তা কার্যক্রম এবং মধ্যস্থতা ও শান্তি প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার উপায়গুলো খতিয়ে দেখতে সম্মত হয়েছি। বিশ্বের বহু অংশে চলমান সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বর্তমান মেরুকরণ ও খণ্ডবিখণ্ড পরিস্থিতি নিয়ে আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করছি। বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় সংকটজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সাম্প্রতিক প্রবণতায় আমরা আশঙ্কা প্রকাশ করছি, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়নের ক্ষতি সাধন করছে।
টেকসই উন্নয়ন, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অবদান রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুগুলোতে বৈচিত্র্যময় জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থানকে সম্মান করে এমন একটি বহুপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে আমরা সওয়াল করি। একই সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের এজেন্ডার সাথে নিরাপত্তাকে যুক্ত করার যেকোনো প্রচেষ্টার ওপর আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। পারমাণবিক বিপদ এবং সংঘাতের বাড়তে থাকা ঝুঁকি নিয়ে আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করছি। বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা অর্জনের জন্য নিরস্ত্রীকরণ, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং অপ্রসারণ ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন ও এর অখণ্ডতা ও কার্যকারিতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা আমরা পুনর্ব্যক্ত করছি।
পারমাণবিক অস্ত্র মুক্ত অঞ্চল গঠনে এবং পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার বা ব্যবহারের হুমকি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান সকল পারমাণবিক-অস্ত্র-মুক্ত অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য অবদানের কথা তুলে ধরে আমরা সেগুলোর প্রতি আমাদের সমর্থন ও সম্মান পুনর্ব্যক্ত করছি। একই সাথে, মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র ও অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র মুক্ত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব বাস্তবায়নে আয়োজিত সম্মেলনসহ (রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত ৭৩/৫৪৬ অনুযায়ী) সমস্ত প্রচেষ্টার গুরুত্ব স্বীকার করছি। এই সম্মেলনে আমন্ত্রিত সকল পক্ষকে সততার সাথে অংশ নিতে এবং গঠনমূলকভাবে যুক্ত হতে আমরা আহ্বান জানাই। আমরা রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব ৭৯/২৪১ "সব দিক থেকে পারমাণবিক-অস্ত্র-মুক্ত অঞ্চলের প্রশ্নের ব্যাপক সমীক্ষা" গ্রহণ এবং সমীক্ষাটির সফল সমাপ্তিকে উল্লেখ করছি, যা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছিল। আমরা রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ১৩২৫ (২০০০) এবং পরবর্তী প্রস্তাবগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়নে এবং নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা এজেন্ডাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি।
সংঘাত প্রতিরোধ ও সমাধান, মানবিক ত্রাণ, মধ্যস্থতা, শান্তি কার্যক্রম, শান্তি বিনির্মাণ এবং সংঘাত-পরবর্তী পুনর্গঠন ও উন্নয়নসহ শান্তি ও নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার সর্বস্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের পূর্ণ, সমান, নিরাপদ ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার গুরুত্ব আমরা পুনরায় উল্লেখ করছি। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি এবং অনাভিপ্রায়ের ওপর ভিত্তি করে গঠিত লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলকে একটি 'শান্তির অঞ্চল' হিসেবে তুলে ধরে, কিউবার ওপর একতরফা অবরোধের কঠোর ব্যবস্থার কারণে দেশটির তৈরি হওয়া পরিস্থিতি, দেশটির অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর এর বিরূপ প্রভাব এবং কিউবার জনগণের ওপর এর উদ্বেগজনক মানবিক প্রভাব নিয়ে আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। এই বিষয়ে, রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব অনুযায়ী কিউবার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও আর্থিক ব্যবস্থা অবিলম্বে বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তা আমরা পুনরায় উল্লেখ করছি।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব