স্টাফ রিপোর্টার:মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের মূল অপেক্ষা কবে শেষ হবে ভেটিং, আর কবে প্রকাশ হবে বহুল প্রতীক্ষিত নবম পে-স্কেলের গেজেট। গেজেটের খসড়া এখন চূড়ান্ত পর্যালোচনা ও হালনাগাদের পর্যায়ে রয়েছে।
এরপর তা আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হলে বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় (বিজি প্রেস) থেকে গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে একটি মূল প্রজ্ঞাপনের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য আরও ৫ থেকে ৭টি এসআরও জারির প্রস্তুতিও চলছে।
একই সঙ্গে নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পুনর্নির্ধারণের জন্য আইবাস প্লাস প্লাসে (আইবাস++) প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার কাজ চলছে। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনসংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন পে-স্কেলের মূল সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন বা জটিলতা নেই। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এখন মূল কাজ হচ্ছে আইনি যাচাই, বিভিন্ন শ্রেণির জন্য পৃথক বিধান চূড়ান্ত করা এবং বেতন-ভাতা বাস্তবায়নের কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন করা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পে-স্কেল নিয়ে কাজ করা এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘খসড়া পর্যালোচনা করে কোথাও কোনো অসংগতি থাকলে তা হালনাগাদ করা হচ্ছে। কাজ শেষ করে দ্রুত আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। ভেটিং শেষে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে বিজি প্রেসে পাঠানো হবে।’
গেজেটের আগে আরও কয়েক ধাপ
মন্ত্রিসভা গত ৩১ আগস্ট জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন করে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর সরাসরি গেজেট প্রকাশের সুযোগ নেই। খসড়া প্রজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট এসআরও প্রস্তুত, আইনগত যাচাই এবং বিজি প্রেসের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার পরই তা প্রকাশ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, পে-স্কেলের কাগজপত্র অনেক বেশি। একটি মূল গেজেটের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক এসআরও প্রস্তুত করা হচ্ছে। এ কারণে এক পৃষ্ঠার কোনো নথির মতো দ্রুত ভেটিং করিয়ে ফেলার সুযোগ নেই। তবে দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, ‘পে-স্কেল বাস্তবায়নে কোনো জটিলতা নেই। আমরা এমনভাবে কাজ করছি, যাতে পরে বাস্তবায়নের সময় কোনো ত্রুটি বা জটিলতা তৈরি না হয়।’
আইবাস++-এও চলছে প্রস্তুতি
গেজেটের পাশাপাশি নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সরকারের বেতন-ভাতা ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার আইবাস++ এ প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার কাজও চলছে। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনসংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, ২০১৫ সালে বর্তমান পে-স্কেল চালুর সময় আইবাস++ ছিল না। এবার নতুন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। ফলে সফটওয়্যারে প্রয়োজনীয় তথ্য ও হিসাবের কাঠামো হালনাগাদ করতে হচ্ছে।
বিশেষ করে যারা ইতিমধ্যে অবসরে গেছেন, তাদের পেনশনসংক্রান্ত তথ্য আইবাস++ এ ঠিকঠাকভাবে যুক্ত ও হালনাগাদ করার প্রয়োজন রয়েছে। তবে বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের জটিলতা তুলনামূলক কম।
পৃথক এসআরও
নতুন পে-স্কেলের মূল কাঠামোর পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও আর্থিক সুবিধা কীভাবে কার্যকর হবে, তা পৃথক এসআরওতে নির্ধারণ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য পৃথক এসআরওগুলোর আওতায় থাকবে—বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, বাংলাদেশ পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, সশস্ত্র বাহিনী, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস, সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিশেষ শ্রেণি বা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োগবিধি।
এসব এসআরওতে বেতন নির্ধারণ (ফিক্সেশন), ভাতা, পেনশন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা বাস্তবায়নের বিস্তারিত বিধান থাকবে।
সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল থাকছে। ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
নতুন কাঠামোয় প্রথম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০তম গ্রেডে মূল বেতন বাড়বে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাতও কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ভাতার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
পেনশনও বাড়বে ধাপে ধাপে
নতুন পে-স্কেলের প্রভাব পড়বে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনেও। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিট পেনশনপ্রাপ্তদের জন্য বিভিন্ন স্তরে বৃদ্ধির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
মাসে ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ১০০ শতাংশ, ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৫৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সামরিক ও অসামরিক ক্ষেত্রে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থা ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি ও বিপুল আর্থিক সংশ্লেষের কারণে এটি একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না।
দুই অর্থবছরে ধাপে বাস্তবায়ন
নতুন পে-স্কেল একবারে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে না। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিন ধাপে কার্যকর হবে। বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
অপেক্ষা গেজেটের
নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন পুনর্নির্ধারণ, বেতন ফিক্সেশন এবং বকেয়া পাওনা সমন্বয়ের প্রক্রিয়া শুরু করার পথ খুলবে। একই সঙ্গে পেনশনভোগীদের তথ্য হালনাগাদ ও নতুন কাঠামো অনুযায়ী পেনশন পুনর্নির্ধারণের কাজও এগিয়ে নেওয়া যাবে।
সরকারের হিসাবে, নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী। এতে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ