ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: বিশ্ব অর্থনীতিজুড়ে যখন মন্দা ও অনিশ্চয়তার কালো মেঘ, ঠিক তখনই প্রবৃদ্ধির গতিতে অভাবনীয় চমক দেখাচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। সম্প্রতি এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল, ফিচ এবং মুডিসের মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ঋণমান নির্ণয়কারী সংস্থাগুলো ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে।
হঠাৎ করে বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর এমন জোরালো আস্থা অর্জনের পেছনে দেশটির শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা, মূলধনী বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক সংকট সামলানোর সক্ষমতাকে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।
প্রত্যাশার চেয়েও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির তথ্য উপহার দিয়েছে ভারত
ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়ানোর তাৎক্ষণিক কারণ হলো ভারতের জুন ত্রৈমাসিকের (কোয়ার্টার) জিডিপি ডেটা। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে দেশটির অর্থনীতি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এটি অনেক অর্থনীতিবিদ এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক ঋণমান কোম্পানি এসঅ্যান্ডপি জানায়, জুন ত্রৈমাসিকের এই প্রবৃদ্ধি অর্জনে জোরালো শিল্প কার্যক্রম, সুষ্ঠু ভোগব্যয়, শক্তিশালী পণ্য রফতানি এবং ভারত সরকারের ত্বরান্বিত বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলে সংস্থাটি তাদের পূর্ণাঙ্গ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬.৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করেছে।
জুন ত্রৈমাসিকের এই শক্তিশালী পারফরম্যান্সের কথা উল্লেখ করেই ফিচও তাদের পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৬.৯ শতাংশ করেছে। রেটিং সংস্থাটি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ধাক্কা এবং চলতি বছরের প্রথমার্ধে বাণিজ্য শর্তের অবনতি হওয়া সত্ত্বেও ভারতের অর্থনীতি স্থিতিশীল রয়েছে।
এখনও খরচ করে চলেছেন ভারতের ভোক্তারা
এই আশাবাদের পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় বা অভ্যন্তরীণ চাহিদা। এশিয়ার অনেক বড় বড় উৎপাদনমুখী অর্থনীতির দেশের মতো ভারতের প্রবৃদ্ধি রফতানির ওপর অতটা নির্ভরশীল নয়। বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে পড়লেও বিষয়টি ভারতীয় অর্থনীতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করে।
এসঅ্যান্ডপি তাদের পূর্বাভাস বাড়ানোর কারণ হিসেবে বিশেষভাবে শক্তিশালী ভোগব্যয়ের প্রবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি আরও জানায়, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের বিনিয়োগের গতি সবচেয়ে শক্তিশালী। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কারণ টেকসই ভোগব্যয় গাড়ি ও আবাসন থেকে শুরু করে আর্থিক পরিষেবা, ভ্রমণ এবং ভোগ্যপণ্যের মতো সবকিছুতেই চাহিদা তৈরি করে।
নোমুরার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে বিশেষ করে ভোগব্যয়কে ভারতের প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের প্রভাব খুচরা জ্বালানি মূল্যে খুব একটা না পড়া এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকায় তা পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করতে সাহায্য করেছে।
বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির একটি বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে
দ্বিতীয় প্রধান স্তম্ভটি হলো বিনিয়োগ। অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে সচল রাখতে ভারত সরকারের মূলধনী ব্যয় (ক্যাপেক্স) একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে চলেছে। এসঅ্যান্ডপির মতে, ভারত সরকারের ত্বরান্বিত বিনিয়োগই জুন ত্রৈমাসিকে তাদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের অন্যতম কারণ। ফিচও বেসরকারি বিনিয়োগ আরও শক্তিশালী হওয়ার লক্ষণ দেখতে পাচ্ছে। সংস্থাটির মতে, চলতি অর্থবছরে বিনিয়োগ ১০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে। রেটিং সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ভারতে জুলাই মাসে খাদ্যবহির্ভূত ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল বছরে ১৯ শতাংশ।
প্রত্যাশার চেয়ে ভালোভাবে বাহ্যিক ধাক্কা সামলে নিয়েছে ভারত
ভারতকে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং বাণিজ্যের ওপর চাপের মতো নানা পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তবুও দেশটির প্রবৃদ্ধি থমকে যায়নি।
ফিচ বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, ৭.৮ শতাংশের জুন ত্রৈমাসিকের প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে মার্কিন-ইরান যুদ্ধের ধাক্কা মোকাবিলায় অর্থনীতি কতটা স্থিতিস্থাপক। একই ধরনের যুক্তি দেখিয়েছে মুডিসও। ইরান সংঘাতের মধ্যেও অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতার কথা উল্লেখ করে ভারতের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করেছে তারা। তবে সংস্থাটি এও সতর্ক করেছে যে, উচ্চ জ্বালানি তেলের দাম এবং এল নিনো সংক্রান্ত খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।
প্রবৃদ্ধির ধারায় নতুন মাত্রা যোগ করছে পণ্য রপ্তানি
জুন ত্রৈমাসিকের পারফরম্যান্সের পেছনে শক্তিশালী পণ্য রফতানিও একটি ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছে এসঅ্যান্ডপি। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ভারতের প্রবৃদ্ধির গল্পটি এখন কোনো একটি একক উৎসের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং একাধিক খাতের মাধ্যমে এটি পুষ্ট হচ্ছে। ভোগব্যয় চাহিদা বাড়াচ্ছে, সরকারি ব্যয় বিনিয়োগকে সহায়তা করছে, বেসরকারি বিনিয়োগ শক্তিশালী হওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে এবং রফতানি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অতিরিক্ত উৎস হিসেবে কাজ করছে।
ঝুঁকি ও ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা
ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধির এই পূর্বাভাসগুলোকে অর্থনীতির সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত সনদ হিসেবে দেখা উচিত নয় বলে সতর্ক করেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। এসঅ্যান্ডপির প্রত্যাশা, চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি গড়ে ৫.১ শতাংশে দাঁড়াবে। পাশাপাশি ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক পলিসি রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়াতে পারে। তেলের দাম বাড়লে তা মূল্যস্ফীতি এবং রুপির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। জোরালো চাহিদা, মূল্যচাপ এবং প্রতিকূল সরবরাহের কথা উল্লেখ করে ফিচও আশা করছে যে রিজার্ভ ব্যাংক অক্টোবরে সুদের হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়াতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ড. ত্রিপাঠি সতর্ক করে বলছেন, রেটিং সংস্থাগুলো চলতি অর্থবছরের শুরুর অবস্থা নিয়ে বেশি আশাবাদী। তবে এর মানে এই নয় যে পুরো বছরটি ভারতের জন্য একেবারেই বাধাহীনভাবে কাটবে।
রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ