স্টাফ রিপোর্টার: চলতি বছরের শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, দাবানল ও পানির সংকট আরও তীব্র হতে পারে। এর ফলে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের নতুন এক গবেষণায় এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, এল নিনোর প্রভাবে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত তাপমাত্রা বাড়ায় এই মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে আগামী ছয় মাসে বাংলাদেশে অতিরিক্ত ৬০০ জনের মতো মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা। সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত সময়ে অতিরিক্ত তাপের কারণে এসব মৃত্যুর সম্ভাবনা রয়েছে।
জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের এক হিসাব অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল তাপজনিত মৃত্যুর ঝুঁকিতে তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে।
এর মধ্যে খুলনায় প্রায় ৩১০টি অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে।
দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো
গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) জানিয়েছে, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনো অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ।
আবহাওয়াবিদদের ধারণা, ২০২৬ সালের শেষ দিকে এল নিনো খুব শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। কোথাও বাড়তে পারে তীব্র গরম ও খরা, আবার কোথাও দেখা দিতে পারে অতিবৃষ্টি ও বন্যা।
WMO-এর সেপ্টেম্বর–নভেম্বর ২০২৬ মৌসুমি পূর্বাভাসেও বিশ্বের বিস্তীর্ণ স্থলভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
খুলনায় ঝুঁকি বেশি কেন?
ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের গবেষণায় বিশ্বের ২৪ হাজার ৩৭৮টি অঞ্চলে তাপমাত্রা ও মৃত্যুহারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এরপর আগামী মাসগুলোর সম্ভাব্য তাপমাত্রার পূর্বাভাসের সঙ্গে এসব তথ্য মিলিয়ে অতিরিক্ত মৃত্যুর হিসাব করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৯৯৬ থেকে ২০২৫ সালকে স্বাভাবিক পরিস্থিতির ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ, একই সময়ে একটি গড় বছরে যত মৃত্যু হওয়ার কথা, তার তুলনায় এল নিনোর সময়ে সম্ভাব্য অতিরিক্ত মৃত্যুর হিসাব করা হয়েছে।
তাই এগুলো ইতোমধ্যে ঘটে যাওয়া মৃত্যুর সংখ্যা নয়। এগুলো তাপমাত্রার পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা মডেলভিত্তিক অনুমান।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
চরম তাপের প্রভাব সবার ওপর সমান পড়ে না। বিশেষ করে—
বয়স্ক মানুষ;
খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমিক;
যাদের ঘরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ বা পর্যাপ্ত শীতল থাকার ব্যবস্থা নেই;
দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী;
পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ যাদের কম—
তারা অতিরিক্ত গরমে বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগাম তাপমাত্রার সতর্কবার্তা, পর্যাপ্ত কুলিং বা ঠান্ডা থাকার ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানো এবং খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব।
শুধু তাপ নয়, বাড়তে পারে খরা-বন্যার ঝুঁকিও
এল নিনোর প্রভাব শুধু তাপমাত্রার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরনও বদলে যেতে পারে।
কোথাও দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা ও খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে, আবার অন্য কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা দেখা দিতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষি, পানির সরবরাহ ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর।
বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগে থেকেই ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশ্বজুড়ে সাড়ে ৪ লাখের বেশি অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান এল নিনো পর্বে বিশ্বজুড়ে ৪ লাখ ৫০ হাজারের বেশি অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যু হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, ভারত ও ব্রাজিলে।
সাহেল অঞ্চলের দেশগুলোতে সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৬৬ হাজার ৮০০ অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর হিসাব করা হয়েছে। এর মধ্যে নাইজেরিয়ায় ৩১ হাজার ৪০০, সুদানে ১৭ হাজার ৫০০, নাইজারে ১০ হাজার এবং চাদে প্রায় ৮ হাজার মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় মিলিয়ে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ হতে পারে। ইন্দোনেশিয়ায় একাই প্রায় ১৯ হাজার ৩০০, ভারতে ১৫ হাজার ৮০০ এবং ব্রাজিলে ১৩ হাজার ৩০০ অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে এই সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৫০০ হতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
উষ্ণ পৃথিবীতে এল নিনোর নতুন সতর্কবার্তা
গবেষকদের মতে, এই অতিরিক্ত উষ্ণতার পুরোটা শুধু এল নিনোর কারণে হচ্ছে না। এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা হলেও এবার এটি এমন একটি পৃথিবীতে ঘটছে, যেখানে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ইতোমধ্যে অনেক বেড়েছে।
গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, এল নিনোর সময়ে বৈশ্বিক স্থলভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। একই সঙ্গে অত্যন্ত গরম দিনের সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ বাড়তে পারে।
গবেষকেরা এই পরিস্থিতিকে ভবিষ্যতের আরও উষ্ণ পৃথিবীর একটি সম্ভাব্য চিত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তবে WMO সতর্ক করে দিয়েছে, এল নিনো কতটা শক্তিশালী—শুধু তা দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট দেশের আবহাওয়া কেমন হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের পরিস্থিতিসহ অন্যান্য জলবায়ু ব্যবস্থাও স্থানীয় আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতকে প্রভাবিত করতে পারে।
ঝুঁকি ছয় মাসের পরও থাকতে পারে
গবেষণার বর্তমান হিসাব সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত সময়কে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, উত্তর গোলার্ধের কিছু এলাকায় তাপজনিত অতিরিক্ত মৃত্যুর ঝুঁকি ২০২৭ সালের জুন বা জুলাই পর্যন্তও অব্যাহত থাকতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে খুলনায় প্রায় ৩১০টি অতিরিক্ত মৃত্যুর সম্ভাবনার হিসাবটি বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। এল নিনো, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্থানীয় আবহাওয়ার সম্মিলিত প্রভাবে আগামী মাসগুলোতে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।
রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ