ফেনী প্রতিনিধি: উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে স্বৈরাচার ও গুপ্ত দল আবার এক হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ধারা অব্যহত রাখতে দেশে বিশৃঙ্খলারোধে জনগনকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দেশবিরোধী সড়যন্ত্র সৃষ্টির পাঁয়তারায় জড়িতদের কঠোর জবাব দিতে জনগনের প্রতি আহবানও জানান প্রধানমন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকেলে ফেনীর ফুলগাজী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-পুরোহিতদের সম্মানীসহ বিভিন্ন ভাতা ও সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
সমাজকল্যাণ, কৃষি ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ সময় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় ভাতা প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিছু রাজনৈতিক দল এক দফা, এক দফা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আসলে তারা কী চায়, জনগণের কাছেও তা স্পষ্ট নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে যারা পালিয়ে গেছে এবং যারা এক দফার কথা বলছে, তাদের কাছে প্রশ্ন—তারা দেশের উন্নয়ন চায় কি না।
তিনি বলেন, বিএনপি জনগণের সমর্থন নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে চায়। অন্যরা কী চায়, তা জনগণের সামনে পরিষ্কার করতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে একটি দল বেহেশতের টিকিট বিক্রি করেছিল। অথচ বেহেশত ও দোজখের মালিক একমাত্র আল্লাহ। যারা এমন কাজ করেছে, তারা শিরক ও মুনাফেকি করেছে কি না, উপস্থিত জনতার কাছে সে প্রশ্নও রাখেন তিনি। তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৭ বছর বিএনপির কয়েক হাজার নেতাকর্মী মামলা-হামলা ও গুমের শিকার হয়েছেন। তখন যারা নীরব ছিল, তাদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারা ৭১-এর ভূমিকায় ফিরে গেছে। মনে রাখতে হবে, মানুষ জীবন ও ইজ্জত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে।’ তার দাবি, ১৭ বছর দেশে গণতন্ত্রের চর্চা না থাকায় উন্নয়নের চাকা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। বিএনপি সরকার দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে কর্মে পরিণত করতে চায়।
উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন চাইলে ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি যখনই রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, দেশ ও মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কাজ করেছে। এখন সময় এগিয়ে যাওয়ার। এজন্য অনুকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতি জরুরি। কেউ যাতে অযথা পরিবেশ ঘোলাটে করতে না পারে, সে বিষয়ে জনগণকে সজাগ থাকতে হবে।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার নানামুখী কাজ করছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন ভাতা চালু করায় দল-মত নির্বিশেষে জনগণ উপকৃত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বক্তব্যের শুরুতে ফেনীতে এসে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ফেনীতে এসে তিনি উৎফুল্ল এবং নিজের বাড়ির মতো মনে হচ্ছে। তার মা-বাবা কেউই বেঁচে নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফেনী তার মায়ের বাড়ি, নানার বাড়ি। ফেনীবাসীই তার আপনজন ও অভিভাবক। এ সময় উপস্থিত জনতা হাত উঁচু করে তাকে সমর্থন জানান।
এর আগে, মঞ্চ থেকে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম ও পুরোহিতদের ভাতা প্রদান এবং ২৪৯ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার প্যানেল স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় ফেনী জেলায় ৫ হাজার ৬৪৩ জনকে কার্ড দেওয়ার জন্য নির্ধারণ করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ১ হাজার ১২ জন কৃষক উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্য থেকে ১০ জন কৃষক প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সরাসরি কৃষক কার্ড গ্রহণ করেন।
অন্যদিকে জেলার বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত ও সেবায়েতদের সম্মানী ভাতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় ফেনী জেলায় ২৭৫ জনকে সম্মানীর জন্য মনোনীত করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাদের মধ্য থেকে ছয়জন ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম, দুজন সেবায়েত এবং দুজন পুরোহিত প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সম্মানী গ্রহণ করেন।
মুহুরী-কহুয়া প্রকল্পের উদ্বোধন
দিনব্যাপী সফরের শুরুতে দুপুরে ফেনীর পরশুরামে পৌঁছে বৃষ্টির মধ্যে ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রকল্পটির ব্যয় ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এর আওতায় প্রায় ৬৮ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ এবং ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন করা হবে। এছাড়া ২৭টি সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন ও ৭৭টি ইনলেট নির্মাণের কথা রয়েছে।
প্রকল্পের উদ্বোধনের পর নদীপাড়ে একটি গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, একটি জনবহুল দেশে রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাকর্মী অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটাচ্ছে এবং সেটিকে পুঁজি করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। এতে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হলে এর দায়ও তাদের নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডে শুধু দেশ নয়, বহির্বিশ্বেও বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বিভ্রান্তি থেকে দেশকে বাঁচাতে ১৯৭১ ও ১৯৮৬ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভূমিকা জনগণের সামনে তুলে ধরার কথা বলেন তিনি।
অরাজকতা ও ষড়যন্ত্রকারীদের কঠোর জবাব দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দল যার, দেশটা সবার।’ গণতন্ত্র অব্যাহত রাখার পাশাপাশি উন্নয়ন ও অপপ্রচার রোধেও জনগণকে সজাগ থাকতে হবে।
নাম উল্লেখ না করে একটি রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘দয়া করে আগে নিজের ঘর সামলান, পরে অন্যদের নসিয়ত করুন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১৫০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। একই সঙ্গে এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি বলেন, নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী বিএনপি সরকার গঠন করেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে। এতে সরকারের দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও দেশের ১৩ লাখ কৃষক উপকৃত হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর নোয়াখালীর মানুষ বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাবে। এর ফলে নতুন করে ৩৪ হাজার হেক্টর জমি আবাদের আওতায় আসবে এবং এক লাখ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদন বাড়বে। এতে শস্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
খালেদা জিয়া মহিলা কলেজ জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি
পরশুরামের কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রী ফুলগাজীতে প্রতিষ্ঠিত বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজে যান। সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে বিএনপি সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন ও সিদ্ধান্ত তুলে ধরেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর নারী শিক্ষার প্রসারে প্রথম যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। ২০০১ সালে তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু করে। সে সরকারের সময় দেশ নকলমুক্ত হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
এ সময় শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নামে প্রতিষ্ঠিত মহিলা কলেজটি জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী। তবে ভালো ও গুণগত ফলাফলের শর্ত দেন তিনি। পরে কলেজ মাঠে একটি গাছের চারা রোপণ করেন।
এসব অনুষ্ঠানে পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়কমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড জাহিদ হোসেন, কৃষিমন্ত্রী আমিনুর রশিদ এয়াছিন, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল, ধর্ম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার, ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু, ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব