ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কাছে বাণিজ্যিক জাহাজে একের পর এক হামলার ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ডুবে গেছে আরও দুটি জাহাজ। জাহাজ দুটির একটি কনটেইনারবাহী এবং অন্যটি শুকনো পণ্য পরিবহনের কাজে নিয়োজিত ছিল। এ ঘটনায় একজন নাবিক নিহত হয়েছেন। তবে অপর জাহাজটির ২১ জন নাবিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডুবে যাওয়া জাহাজ দুটি হলো সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী ‘জিএফএস প্রাইড’ এবং অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার পতাকাবাহী ‘কেপ দাও’। জাহাজ দুটিতে হামলা ও ডুবে যাওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপরিবহন এবং গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, জিএফএস প্রাইডে হামলার পর জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। পরে সেটি ডুবে যায়। জাহাজটির ২১ জন নাবিককে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে, কেপ দাও জাহাজটি প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ডুবে যায়। এ ঘটনায় একজন নাবিক নিহত হন। জাহাজ দুটির ক্ষয়ক্ষতি এবং হতাহতের ঘটনা হরমুজ প্রণালির আশপাশে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
সিঙ্গাপুরের মেরিটাইম অ্যান্ড পোর্ট অথরিটি (এমপিএ) জানিয়েছে, মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় জিএফএস প্রাইড ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলার পর জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং একপর্যায়ে এটি ডুবে যায়। তবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় জাহাজটিতে থাকা সব নাবিককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
এমপিএর তথ্য অনুযায়ী, জিএফএস প্রাইডের ২১ জন নাবিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় কোনো নাবিক আহত হননি। উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে জাহাজটির সব নাবিককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও জাহাজটি রক্ষা করা যায়নি।
হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। বিশেষ করে জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে এ জলপথের কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। ফলে এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তার জন্যই নয়, আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ব্যবস্থার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
জিএফএস প্রাইডের ডুবে যাওয়ার ঘটনায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে এ অঞ্চলে হামলার ঝুঁকি কেবল তেলবাহী ট্যাংকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; কনটেইনারবাহী ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনকারী জাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার পতাকাবাহী কেপ দাও জাহাজটি গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের নৌপরিবহন সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও)। পরবর্তী সময়ে জাহাজটি হরমুজ প্রণালির কাছে ডুবে যায়।
আইএমওর তথ্য অনুযায়ী, হামলার পরপরই জাহাজটির নাবিকদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে এ ঘটনায় একজন নাবিকের মৃত্যু হয়েছে। জাহাজটির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত ডুবে যাওয়ার ঘটনা এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক নৌযানের ওপর হামলার গুরুতর প্রভাব তুলে ধরেছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে প্রজেক্টাইল বলতে সাধারণত ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট বা অন্য কোনো নিক্ষিপ্ত বস্তু বোঝানো হয়, যা আঘাত হেনে জাহাজের কাঠামো ও যন্ত্রপাতির ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। তবে কেপ দাওয়ের ক্ষেত্রে ঠিক কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
জাহাজটির নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হলেও একজনের প্রাণহানির ঘটনা এ হামলার মানবিক ক্ষয়ক্ষতিকে সামনে এনেছে। একই সঙ্গে জাহাজের মালিকানা, পণ্য পরিবহন এবং নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
আইএমওর জাহাজ দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জিএফএস প্রাইড ও কেপ দাও হলো ডুবে যাওয়া দ্বিতীয় ও তৃতীয় জাহাজ। অর্থাৎ, সংঘাত শুরুর পর থেকে এ অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ক্রমেই গুরুতর আকার ধারণ করছে।
বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং সেগুলো ডুবে যাওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন খাতে নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু নাবিকদের জীবনই ঝুঁকির মুখে পড়ে না; এর সঙ্গে জড়িত পণ্য পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ এবং পণ্য পরিবহনে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। এ কারণে সাম্প্রতিক হামলাগুলোকে ঘিরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বাড়ছে।
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিঙ্গাপুরের মেরিটাইম অ্যান্ড পোর্ট অথরিটি (এমপিএ)। সংস্থাটি বলেছে, এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ফলে নাবিকদের জীবন বিপন্ন হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ে। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সিঙ্গাপুরের এমপিএর উদ্বেগের বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সামুদ্রিক পরিবহন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এ ধরনের হামলা অব্যাহত থাকলে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হতে পারে। একই সঙ্গে জাহাজের চলাচল, পণ্য পরিবহন এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় নতুন জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান মারিস্কস জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হুমকি অব্যাহত রয়েছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি শুধু তেলবাহী ট্যাংকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কনটেইনারবাহী জাহাজ এবং শুকনো পণ্য পরিবহনকারী জাহাজও গুরুতর ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে জিএফএস প্রাইড ও কেপ দাওয়ের ডুবে যাওয়ার ঘটনা এ উদ্বেগকে আরও জোরালো করেছে। কারণ, এ ধরনের জাহাজে বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা হয়। ফলে এসব জাহাজের চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়তে পারে।
মারিস্কসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য ঝুঁকি এখনো বিদ্যমান। এ অবস্থায় জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
এ অঞ্চলে হামলার ঘটনা অব্যাহত থাকলে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে সংঘাতপূর্ণ এলাকার মধ্য দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা মূল্যায়ন, যাত্রাপথ নির্ধারণ এবং নাবিকদের সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার চেষ্টা করছে ইরান। দেশটির বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞার জবাবে হামলা বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে তেহরান। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি কিংবা বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল ব্যাহত হলে তার প্রভাব আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক হামলায় দুটি জাহাজ ডুবে যাওয়া, একজন নাবিকের মৃত্যু এবং অন্য জাহাজের ২১ জন নাবিককে উদ্ধার করার ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামনে এনেছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে স্বাভাবিক চলাচল বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা এবং নাবিকদের জীবন রক্ষার বিষয়গুলো এখন এ অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম