বেনাপোল প্রতিনিধি: ডিজিটাল যুগে চিকিৎসাসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও যশোরের অধিকাংশ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে এখনো হাতে লেখা হচ্ছে রোগীদের ব্যবস্থাপত্র। অনেক চিকিৎসকের হাতের লেখা অস্পষ্ট হওয়ায় ওষুধের নাম ও সেবনবিধি বুঝতে ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও স্বজনেরা। একই সমস্যায় পড়ছেন ফার্মেসির ওষুধ বিক্রেতারাও। এতে ভুল ওষুধ পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সময় ও অর্থের অপচয় হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
রোগীদের অভিযোগ, প্রেসক্রিপশনের লেখা অস্পষ্ট হলে অনেক সময় ওষুধের নাম ও প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের ফার্মেসিতে ব্যবস্থাপত্রের লেখা বুঝতে না পারলে কিছু বিক্রয়কর্মী অনুমানের ভিত্তিতে ওষুধ দেওয়ার সুযোগ পান। এতে রোগীর ভুল ওষুধ পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে চিকিৎসকদের স্পষ্ট অক্ষরে প্রেসক্রিপশন লেখা অথবা কম্পিউটারে ব্যবস্থাপত্র তৈরির দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যশোরের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটারে প্রেসক্রিপশন লেখা হয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই এখনো হাতে লেখা ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হচ্ছে। কিছু চিকিৎসকের লেখা সহজে পড়া গেলেও অন্যদের প্রেসক্রিপশনে ওষুধের নাম ও চিকিৎসাসংক্রান্ত নির্দেশনা বুঝতে সমস্যায় পড়তে হয়।
প্রেসক্রিপশনের লেখা অস্পষ্ট হওয়ায় ফার্মেসিকর্মীদেরও প্রায়ই বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। ওষুধের নাম নিশ্চিত হতে না পারলে রোগীর কাছ থেকে তথ্য নেওয়া কিংবা ব্যবস্থাপত্র নিয়ে আবার চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিতে হয়। এতে রোগীদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হয়, পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা গ্রহণেও ভোগান্তি বাড়ে।
যশোরের আদ-দীন হাসপাতাল ও ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসকেরা কম্পিউটারে প্রেসক্রিপশন লেখেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুল সাদিক রাসেল রোগীদের সুবিধার্থে ব্যবস্থাপত্রে বড় হাতের বর্ণ ব্যবহার করেন।
অন্যদিকে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালসহ অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে এখনো হাতে লেখা প্রেসক্রিপশন দেওয়া হয়। কয়েকজন চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র পড়তে অসুবিধা হওয়ার অভিযোগ করেছেন রোগীরা। তাঁদের মধ্যে ল্যাব এইড ডায়াগনস্টিকসের ডা. আঞ্জুমান আরা (ইলোরা), কুইন্স হাসপাতালের ডা. আমিনুর রহমান, ডা. আতিক আহমেদ আকন্দ, ডা. শারমিন নাহার (পলি) এবং ল্যাবস্ক্যানের ডা. সিরাজুল ইসলামের প্রেসক্রিপশন নিয়ে রোগীদের অসুবিধার কথা জানা গেছে। এসব চিকিৎসকের কাছে কম্পিউটারে প্রেসক্রিপশন লেখার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
বেনাপোল থেকে কুইন্স হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ইয়ানুর রহমান বলেন, চিকিৎসক হাতে প্রেসক্রিপশন লিখেছেন, কিন্তু তিনি নিজেও সব লেখা বুঝতে পারছেন না। শহরের ফার্মেসিতে ওষুধ কিনতে গিয়ে বিক্রয়কর্মীরা লেখা বুঝতে না পারলে আবার চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু নিজের এলাকায় ফিরে ফার্মেসির কর্মীরা প্রেসক্রিপশন বুঝতে না পারলে অনেক সময় অনুমানের ভিত্তিতে ওষুধ দিয়ে দেন। এতে ভুল ওষুধ পাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সাফায়েত হুসাইন বলেন, সদর হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক বেশি। প্রতিদিন একজন চিকিৎসককে শতাধিক রোগী দেখতে হয়। ৩০ থেকে ৪০ জন রোগী দেখার ক্ষেত্রে কম্পিউটারে প্রেসক্রিপশন লেখা সুবিধাজনক হতে পারে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে কম্পিউটারে ব্যবস্থাপত্র লেখা চিকিৎসকদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। তবে প্রেসক্রিপশন স্পষ্ট ও বড় হাতের বর্ণে লেখার বিষয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, চিকিৎসকদের হাতে প্রেসক্রিপশন লেখার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। তবে লেখা অস্পষ্ট হলে রোগীরা বিপাকে পড়েন। অধিকাংশ চিকিৎসকের হাতের লেখা বোঝা গেলেও কিছু চিকিৎসকের লেখা পড়া কঠিন। যেসব চিকিৎসকের হাতের লেখা স্পষ্ট নয়, তাঁদের আরও সতর্ক হয়ে ব্যবস্থাপত্র লেখার প্রয়োজন।
রোগীদের প্রত্যাশা, চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন লেখার ক্ষেত্রে আরও সচেতনতা, স্পষ্ট অক্ষরের ব্যবহার এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপত্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে ওষুধ কেনার বিড়ম্বনা কমবে। একই সঙ্গে ভুল ওষুধ পাওয়ার ঝুঁকি কমিয়ে রোগীদের নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ