আশিস গুপ্ত: অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে ইউরোপের অন্তত নয়টি দেশে বিক্ষোভ, ধর্মঘট এবং ছাত্র আন্দোলন নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। ফ্রান্স, ইতালি, বেলজিয়াম, স্পেন, পর্তুগাল, গ্রিস, জার্মানি, অস্ট্রিয়া এবং আলবেনিয়ায় আন্দোলনের কারণ এক নয়। কোথাও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কোথাও আবাসনের আকাশছোঁয়া মূল্য, কোথাও শিক্ষাব্যবস্থায় অর্থের অভাব, আবার কোথাও দুর্নীতি, বেকারত্ব কিংবা সামরিক পরিষেবার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ক্ষোভ মানুষকে রাজপথে নামিয়েছে। কিন্তু এই পৃথক আন্দোলনগুলির মধ্যে একটি অভিন্ন সূত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা এবং প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি গভীর অসন্তোষ।
ইউরোপের রাজপথে আজ যে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, তা কেবল বিচ্ছিন্ন কয়েকটি বিক্ষোভ, শ্রমিক ধর্মঘট কিংবা ছাত্র আন্দোলনের সমষ্টি নয়। এর গভীরে রয়েছে এমন এক সামাজিক ক্ষোভ, যা ইউরোপের প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক নীতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি মানুষের আস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। ফ্রান্সের প্যারিস থেকে ইতালির মিলান, স্পেনের মাদ্রিদ থেকে আলবেনিয়ার তিরানা—বিভিন্ন দেশের রাজপথে তরুণ, শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ যখন প্রায় একই সময়ে প্রতিবাদে শামিল হচ্ছেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, ইউরোপ কি নিজের ‘আরব বসন্ত’-এর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে?
এই পরিস্থিতিকে ২০১০ সালের শেষ দিকে শুরু হওয়া আরব বসন্তের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। তিউনিসিয়ায় এক তরুণ পথবিক্রেতার আত্মাহুতি থেকে যে গণবিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল, তা দ্রুত মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন, সিরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা শাসকদের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ গণঅভ্যুত্থানের রূপ নিয়েছিল।
তিউনিসিয়ার জাইন এল আবেদিন বেন আলি এবং মিশরের হোসনি মুবারকের পতন প্রমাণ করেছিল, আপাতদৃষ্টিতে শক্তিশালী রাষ্ট্রক্ষমতার ভিতও গণবিক্ষোভের চাপে ভেঙে পড়তে পারে। আজকের ইউরোপের সঙ্গে সেই সময়ের মিল কোথায়? আবার পার্থক্যই বা কতটা? প্রথমেই মনে রাখতে হবে, ইউরোপের অধিকাংশ দেশ বহুদলীয় নির্বাচন, সংসদীয় রাজনীতি, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক অধিকারের কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। আরব বসন্তের বহু আন্দোলন শুরু হয়েছিল এমন সব দেশে, যেখানে দীর্ঘকাল ধরে কর্তৃত্ববাদী শাসন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য। ইউরোপে পরিস্থিতি আলাদা। এখানে মানুষ শুধু ভোটাধিকার বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবিতে রাস্তায় নামছেন না; তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, নির্বাচিত সরকার থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁদের জীবন ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে? কেন কাজ করেও বাড়িভাড়া মেটানো কঠিন? কেন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে? কেন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দাবি শোনা গেলেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার সুফল যথেষ্টভাবে পৌঁছাচ্ছে না? এই প্রশ্নগুলিই ইউরোপের বর্তমান অস্থিরতার রাজনৈতিক তাৎপর্য নির্ধারণ করছে।
ফ্রান্স এই অস্থিরতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হওয়া ছাত্রবিক্ষোভের মূল অভিযোগ ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট, অপর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, জীর্ণ পরিকাঠামো এবং শিক্ষার সুযোগের অসমতা। পরে সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয় শ্রমিক সংগঠন, অভিভাবক, বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের কর্মী এবং জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ।
১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ মানুষ অংশ নেন। প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের একাংশ হিংসাত্মক সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে পরিণত হয়। ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রায় ২,৪০০ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়। লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক পৌর ভবনে আগুন লাগার ঘটনাও পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। তবে এই হিংসাত্মক ঘটনাগুলিকে আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিপুলসংখ্যক শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীর সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। ফরাসি রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল মাক্রোঁর সরকারের সামনে সমস্যাটি দ্বিমুখী। একদিকে, জনপরিষেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের ক্ষোভের মোকাবিলা করতে হবে; অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় ঋণ ও বাজেট ঘাটতির চাপে সরকারের হাতে ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। সরকার শিক্ষক নিয়োগ ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহায়তার মতো পদক্ষেপের কথা বলেছে। কিন্তু মানুষের অসন্তোষের মূল কারণ যদি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা হয়, তবে সাময়িক আর্থিক সহায়তা দিয়ে সেই ক্ষোভ প্রশমিত করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এই অস্থিরতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ফ্রান্সের আন্দোলন প্রতিবেশী দেশগুলির তরুণদেরও অনুপ্রাণিত করছে। বেলজিয়ামে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি এবং শিক্ষা খাতে সম্ভাব্য কাটছাঁটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। ইতালিতে স্কুল দখল, ছাত্রবিক্ষোভ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সমাবেশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উন্নত মজুরি, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও আবাসনের দাবি। ‘ফ্রান্সের মতো আমরাও করব’—এই ধরনের স্লোগান আন্দোলনগুলির মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ প্রতীকী সংযোগ তৈরি করছে। তবে এই সংযোগের অর্থ এই নয় যে সব দেশের আন্দোলন একই কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হচ্ছে। বরং একটি দেশের প্রতিবাদ অন্য দেশের তরুণদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠছে এবং তাদের নিজস্ব অসন্তোষ প্রকাশের ভাষা জোগাচ্ছে।
স্পেন ও পর্তুগালের পরিস্থিতি ইউরোপের আরেকটি গভীর সংকটকে সামনে এনেছে—আবাসনের অধিকার। স্পেনের মাদ্রিদে ভাড়ার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীরা দিনের পর দিন তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছেন। বার্সেলোনাতেও বাড়িভাড়া, স্বল্পমেয়াদি পর্যটক আবাসনের বিস্তার এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের আবাসনসংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ জমেছে। পর্তুগালের লিসবন ও পোর্তো শহরেও বাড়ির দাম, ভাড়া এবং কম মজুরির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। গত ১৭ অক্টোবর লিসবনে শ্রমিক সংগঠনের আহ্বানে আয়োজিত বিক্ষোভে উচ্চ মজুরি, পেনশন বৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ী আবাসনের দাবি উঠেছে। পর্তুগালে ২০১৭ সালের পর থেকে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সংকটের রাজনৈতিক তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের অর্থনীতি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা হলো, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং উন্নত জনপরিষেবার মাধ্যমে নাগরিকদের একটি স্থিতিশীল জীবন নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু তরুণদের একটি অংশ যদি দেখে যে চাকরি পেয়েও স্বাধীনভাবে বসবাস করা যাচ্ছে না, আয়ের বড় অংশ বাড়িভাড়ায় চলে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে নিজের বাড়ি কেনা প্রায় অসম্ভব, তাহলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রচলিত সংজ্ঞা তাদের কাছে অর্থহীন হয়ে উঠতে পারে। প্রশ্নটি তখন আর শুধু কতটা প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তা নয়; বরং সেই প্রবৃদ্ধির সুফল কারা পাচ্ছে এবং তার মূল্য কে দিচ্ছে।
এই জায়গাতেই ইউরোপের বর্তমান বিক্ষোভ বৃহত্তর অর্থনৈতিক বৈষম্যের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। সম্পদের কেন্দ্রীভবন, বাড়ি ও জমিকে বিনিয়োগের পণ্যে পরিণত করা, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং জনপরিষেবায় ব্যয়ের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে অর্থনীতির সামগ্রিক সাফল্যের সঙ্গে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ব্যবধান বাড়ছে। এই ব্যবধান যত বাড়বে, নির্বাচিত সরকারের প্রতি মানুষের আস্থার সংকটও তত গভীর হবে।
আলবেনিয়ায় ক্ষোভের চরিত্র কিছুটা আলাদা। সেখানে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পাশাপাশি দুর্নীতি, বেকারত্ব, শিক্ষার মান এবং প্রধানমন্ত্রী এদি রামার সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। বিতর্কিত উপকূলীয় উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। ফলে আলবেনিয়ার আন্দোলনকে শুধু জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে তার রাজনৈতিক তাৎপর্যের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যাবে। এখানে প্রশ্ন উঠছে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক ক্ষমতার জবাবদিহিতা এবং উন্নয়নের সুফল কার হাতে যাচ্ছে, তা নিয়ে। জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও গ্রিসেও শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন দেখা যাচ্ছে। জার্মানির বার্লিনে শিক্ষার্থীরা বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা চালুর পরিকল্পনার বিরোধিতা করে প্রতিবাদ করেছেন। তাঁদের একাংশের বক্তব্য, শিক্ষা ও সামাজিক পরিষেবায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগের বদলে সামরিক প্রস্তুতির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অস্ট্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট কমানোর আশঙ্কা এবং শিক্ষার পরিকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ আন্দোলনের কারণ হয়েছে। গ্রিসে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি, শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকট এবং সামরিক ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। এই তিন দেশের আন্দোলন ফ্রান্সের মতো ব্যাপক না হলেও একই ধরনের প্রজন্মগত উদ্বেগের প্রতিফলন সেখানে দেখা যাচ্ছে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। এই নয়টি দেশের আন্দোলন কি সত্যিই পরস্পর সংযুক্ত, নাকি একই সময়ে ঘটে যাওয়া পৃথক প্রতিবাদের সমষ্টি? ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন ও নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আলবার্তো আলেমান্নোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই বিক্ষোভগুলিকে একটি একক, সমন্বিত আন্দোলন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। দেশভেদে দাবি এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির পার্থক্য রয়েছে। তবে শিক্ষায় অর্থের অভাব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষাজীবন শেষে কর্মসংস্থান ও স্থিতিশীল জীবনের অনিশ্চয়তা বিভিন্ন দেশের আন্দোলনের মধ্যে অভিন্ন সূত্র তৈরি করছে। ফ্রান্সের আন্দোলন অন্যত্র প্রতিবাদের অনুপ্রেরণা জোগালেও তার অর্থ এই নয় যে নয়টি দেশের বিক্ষোভের পেছনে কোনও একক সংগঠন বা আন্তর্জাতিক পরিচালনাকেন্দ্র রয়েছে।
অর্থাৎ, এই আন্দোলনগুলির মধ্যে সংযোগ রয়েছে, কিন্তু সেই সংযোগের প্রকৃতি বোঝা জরুরি। একে তিনটি স্তরে দেখা যেতে পারে। প্রথমত, রয়েছে অভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। দ্বিতীয়ত, রয়েছে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে প্রতিবাদের অভিজ্ঞতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়া। তৃতীয়ত, রয়েছে একটি দেশের আন্দোলনকে অন্য দেশের তরুণদের নিজেদের দাবির পক্ষে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা। এই তিনটি প্রক্রিয়া একত্রে আন্দোলনের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করতে পারে, যদিও প্রতিটি দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক বাস্তবতা তার গতিপথ নির্ধারণ করবে।
এই পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। আরব বসন্তের সময় ফেসবুক, টুইটার ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যম প্রতিবাদ সংগঠিত করা, খবর ছড়িয়ে দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারের বিকল্প তথ্যপ্রবাহ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। আজকের ইউরোপে ডিজিটাল যোগাযোগ আরও দ্রুত এবং বিস্তৃত। ভিডিও, সরাসরি সম্প্রচার, প্রতিবাদের ছবি এবং বিভিন্ন দেশের আন্দোলনকারীদের পারস্পরিক সংহতির বার্তা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু ডিজিটাল যোগাযোগের এই শক্তিকে আন্দোলনের সাফল্যের নিশ্চয়তা বলে ধরে নেওয়া যাবে না। অনলাইনে বিপুল সমর্থন অর্জন এবং দীর্ঘদিন ধরে সংগঠিত গণআন্দোলন চালিয়ে যাওয়া দুটি ভিন্ন বিষয়। স্থায়ী রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য সংগঠন, নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট দাবি এবং বৃহত্তর সামাজিক জোট প্রয়োজন।
আরব বসন্তের অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। তিউনিসিয়া ও মিশরে শাসক পতনের পরও গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান হয়নি। লিবিয়া ও ইয়েমেনে রাষ্ট্রীয় ভাঙন ও দীর্ঘ সংঘাত তৈরি হয়েছে; সিরিয়ায় গণবিক্ষোভ ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। অর্থাৎ, কোনও সরকারের বিরুদ্ধে বিপুল জনসমর্থন তৈরি হওয়া এবং তার পর একটি ন্যায়সংগত, গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়। পুরোনো ক্ষমতাকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়লেও তার জায়গায় কী ব্যবস্থা তৈরি হবে, তা নির্ভর করে আন্দোলনের সংগঠন, রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের চরিত্রের ওপর।
ইউরোপের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রযোজ্য। বিক্ষোভ বাড়লেই সরকার পতন ঘটবে, কিংবা গোটা ইউরোপে একযোগে রাজনৈতিক বিপ্লব শুরু হবেএমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর কোনও ভিত্তি নেই। ইউরোপের দেশগুলিতে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে, সংসদীয় বিরোধী দল রয়েছে এবং বহু ক্ষেত্রে বিচারব্যবস্থা ও নাগরিক সমাজের প্রতিষ্ঠান সক্রিয়। ফলে প্রতিবাদকারীদের সামনে আরব বসন্তের সময়কার বহু দেশের তুলনায় ভিন্ন রাজনৈতিক পথ খোলা রয়েছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান থাকা মানেই গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা অটুট থাকবে, এমন নয়। নাগরিকেরা যদি মনে করেন তাঁদের ভোটে সরকার বদলালেও জীবনযাত্রার মৌলিক সমস্যাগুলির পরিবর্তন হচ্ছে না, তাহলে নির্বাচনী রাজনীতির বাইরেও প্রতিবাদের প্রবণতা বাড়তে পারে। এখানেই ইউরোপের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নির্বাচিত সরকারগুলি অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং বাজেট ঘাটতি কমানোর কথা বলছে; অন্যদিকে নাগরিকেরা চাইছেন উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, বাসস্থান এবং সম্মানজনক মজুরি। সরকার যদি প্রতিটি সামাজিক দাবির জবাবে কেবল আর্থিক সীমাবদ্ধতার যুক্তি তুলে ধরে, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা ও সরকারের বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকবে। বিশেষ করে তরুণদের কাছে ভবিষ্যৎ যদি ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে আসে, তাহলে রাজনৈতিক অসন্তোষ আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই শূন্যস্থানকে কাজে লাগাতে পারে ইউরোপের উগ্র দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলিও। ফ্রান্সে ২০২৭ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে থাকায় বর্তমান অস্থিরতা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে উঠেছে। মাক্রোঁর দুর্বলতা থেকে লাভবান হতে পারেন অভিবাসনবিরোধী এবং কঠোর আইনশৃঙ্খলার পক্ষে থাকা নেতারা। অন্যদিকে বামপন্থী শক্তিরাও জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক বৈষম্য এবং জনপরিষেবায় বিনিয়োগের প্রশ্নকে সামনে এনে সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আসন্ন নির্বাচনগুলি এই বিক্ষোভের রাজনৈতিক পরিণতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
তবে উগ্র দক্ষিণপন্থার উত্থানকে কেবল বিক্ষোভের অনিবার্য পরিণতি বলে মনে করা ভুল হবে। জনঅসন্তোষকে কোন রাজনৈতিক শক্তি কীভাবে ব্যাখ্যা করছে, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি বেকারত্ব, আবাসনসংকট ও জনপরিষেবার দুরবস্থার জন্য অভিবাসীদের দায়ী করে, তাহলে প্রকৃত অর্থনৈতিক ও নীতিগত সমস্যাগুলি আড়ালে থেকে যেতে পারে। আবার কেউ যদি প্রতিটি প্রতিবাদকে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র বলে চিহ্নিত করে, তাহলে নাগরিকদের ন্যায্য দাবিগুলিও অবজ্ঞার শিকার হবে। উভয় ক্ষেত্রেই গণতান্ত্রিক বিতর্কের জায়গা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরেকটি বিপদ হলো, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হিংসাত্মক ঘটনাগুলিকে একাকার করে দেখা। ফ্রান্সে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ জনজীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি করেছে। এই ঘটনাগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, বিচ্ছিন্ন হিংসার অজুহাতে শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ নাগরিকদের বৃহত্তর দাবিগুলিকে বাতিল করে দেওয়াও বিপজ্জনক। গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ একটি মৌলিক অধিকার; রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই অধিকার রক্ষা করা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতা বজায় রাখা।
বর্তমান আন্দোলনের আরেকটি বৈশ্বিক তাৎপর্য রয়েছে। বাংলাদেশ, নেপালসহ বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তরুণদের আন্দোলন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। ইউরোপের তরুণদের ক্ষোভও একই ধরনের প্রজন্মগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত—অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ। কিন্তু এক দেশের অভিজ্ঞতাকে অন্য দেশের পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি মেলানো যায় না। প্রতিটি দেশের অর্থনীতি, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক বৈষম্যের ধরন আলাদা। তবু একটি বিষয় ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে: তরুণ প্রজন্ম শুধু উন্নত ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি শুনতে চাইছে না; তারা সেই ভবিষ্যৎ তৈরির বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চাইছে।
তাহলে ইউরোপ কি নিজের আরব বসন্তের মুহূর্তে প্রবেশ করেছে? এই মুহূর্তে সবচেয়ে যুক্তিসংগত উত্তর হলো—ইউরোপে গণঅসন্তোষের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় শুরু হয়েছে, কিন্তু তাকে আরব বসন্তের সমতুল্য গণঅভ্যুত্থান বলে ঘোষণা করার সময় এখনও আসেনি। নয়টি দেশে আন্দোলনের উপস্থিতি একটি বিস্তৃত সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। ফ্রান্সের মতো দেশে বিক্ষোভের ব্যাপকতা, ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ, স্পেন ও পর্তুগালে আবাসনসংকট, বেলজিয়াম ও অস্ট্রিয়ায় শিক্ষা নিয়ে উদ্বেগ এবং আলবেনিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী প্রতিবাদ—সবই দেখাচ্ছে, ইউরোপের বিভিন্ন সমাজে প্রচলিত নীতির প্রতি অসন্তোষ জমছে। কিন্তু এগুলি এখনও একক রাজনৈতিক কর্মসূচি, অভিন্ন নেতৃত্ব কিংবা একই লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত আন্দোলনে পরিণত হয়নি।
আগামী দিনে এই আন্দোলনগুলি কতটা স্থায়ী হয়, সরকারগুলি তাদের দাবির জবাবে কী পদক্ষেপ নেয়, শ্রমিক সংগঠন ও ছাত্রসমাজের মধ্যে কতটা সমন্বয় তৈরি হয় এবং আসন্ন নির্বাচনে জনঅসন্তোষ কীভাবে প্রতিফলিত হয়—এসবের ওপর নির্ভর করবে পরিস্থিতির গতিপথ। সরকার যদি কেবল পুলিশি ব্যবস্থা ও সাময়িক আর্থিক আশ্বাসের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামলাতে চায়, তাহলে ক্ষোভ আবারও বিস্ফোরিত হতে পারে। অন্যদিকে শিক্ষা, আবাসন, স্বাস্থ্য, মজুরি এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারলে আন্দোলনের চাপ নীতিগত সংস্কারের পথও খুলে দিতে পারে।
ইউরোপের সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু আরব বসন্তের পুনরাবৃত্তি ঘটবে কি না, তা নয়। আরও মৌলিক প্রশ্ন হলো, ইউরোপের গণতন্ত্র কি তার নাগরিকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে দিতে পারবে? কারণ রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন মানুষ সেই স্বাধীনতার মধ্যে একটি সম্মানজনক জীবন গড়ে তোলার বাস্তব সুযোগ দেখতে পান।
স্পিন
ইউরোপের বর্তমান বিক্ষোভগুলিতে বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী দুই ধরনের রাজনৈতিক প্রভাবই রয়েছে, তবে তাদের ভূমিকা এক নয়। বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে থাকা গোষ্ঠীগুলি বহু জায়গায় আন্দোলন সংগঠিত করছে বা তাতে অংশ নিচ্ছে। অন্যদিকে, দক্ষিণপন্থী দলগুলি অনেক ক্ষেত্রে এই অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে সরকারের ব্যর্থতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতার প্রশ্ন তুলে নিজেদের সমর্থন বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার: কোনও আন্দোলনে বামপন্থী সংগঠনের উপস্থিতি থাকলেই পুরো আন্দোলন বামপন্থী হয়ে যায় না; একইভাবে, বিক্ষোভের ফলে দক্ষিণপন্থীরা রাজনৈতিক সুবিধা পেলেই সেই বিক্ষোভকে দক্ষিণপন্থীদের পরিচালিত আন্দোলন বলা যায় না।
ফ্রান্সে শ্রমিক সংগঠন জেনেরাল কনফেডারেশন অব লেবার (CGT), ছাত্র আন্দোলন এবং বামপন্থী দল La France Insoumise-এর রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ, মজুরি, পেনশন ও জীবনযাত্রার ব্যয় আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। অন্যদিকে, অস্থিরতা ও হিংসার ঘটনায় দক্ষিণপন্থী National Rally-র নেত্রী মেরিন ল্য পেনের রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইতালিতে ইতালিয়ান জেনারেল কনফেডারেশন অফ লেবার (CGIL)-এর মতো শ্রমিক সংগঠন এবং Potere al Popolo-র মতো বামপন্থী শক্তি প্রতিবাদে সক্রিয়। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির দক্ষিণপন্থী সরকারের শিক্ষা, জ্বালানি ও ব্যয়নীতি নিয়ে অসন্তোষ আন্দোলনের একটি অংশ। সরকার আবার হিংসাত্মক ঘটনাগুলিকে আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে তুলে ধরে কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে।
স্পেনে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ, উচ্ছেদ বন্ধ এবং সাশ্রয়ী আবাসনের দাবিতে আন্দোলনের সঙ্গে সামাজিক সংগঠন ও শ্রমিক ইউনিয়নের যোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সমাজতান্ত্রিক সরকার আবাসন সংস্কারের চেষ্টা করলেও রক্ষণশীল ও দক্ষিণপন্থী দলগুলির বিরোধিতা রয়েছে। ফলে আবাসনের প্রশ্নটি সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতির অংশ হয়ে উঠেছে।
পর্তুগালে দেশের প্রধান বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন জেনারেল কনফেডারেশন অফ পর্তুগিজ ওয়ার্কার্স (CGTP)-র নেতৃত্বে মজুরি ও পেনশন বৃদ্ধি এবং আবাসনসংকটের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। এখানে সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলনের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে কোনও নির্দিষ্ট বামপন্থী দলের সমর্থক বলে ধরে নেওয়া যায় না।
বেলজিয়ামে ছাত্র ও শিক্ষক আন্দোলনের সঙ্গে বামপন্থী সংহতি শিক্ষায় ব্যয়সংকোচন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি এবং শিক্ষক সংকটের বিরুদ্ধে আন্দোলনে রয়েছে। একই সঙ্গে বিক্ষোভের হিংসাত্মক ঘটনাগুলিকে কেন্দ্র করে দক্ষিণপন্থী ও মধ্য-দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলি কঠোর আইনশৃঙ্খলার দাবি সামনে আনছে।
আলবেনিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন স্পষ্ট বাম-ডান বিভাজনের বাইরে প্রধানমন্ত্রী এদি রামার সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা নিয়ে ক্ষোভের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ। এখানে আন্দোলনের প্রধান চরিত্র সরকারবিরোধী ও জবাবদিহির দাবিনির্ভর। একে সরাসরি বামপন্থী বা দক্ষিণপন্থী আন্দোলন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও গ্রিসের ক্ষেত্রেও ছাত্র ও তরুণদের আন্দোলনে শিক্ষা, সামাজিক ব্যয় এবং সামরিকীকরণের বিরোধিতার মতো বামঘেঁষা দাবি দেখা যায়। তবে এই তিন দেশে সব আন্দোলনের সংগঠন, ব্যাপ্তি ও রাজনৈতিক চরিত্র এক নয়। তাই সবকটিকে একটি অভিন্ন বামপন্থী আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করা যথাযথ হবে না।
এই বিক্ষোভগুলির মধ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে। আন্দোলনের সামাজিক দাবিগুলি অনেক ক্ষেত্রে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কিন্তু সেই আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে দক্ষিণপন্থীরাও লাভবান হতে পারে। এর তিনটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, শ্রমিক ইউনিয়ন ও বামপন্থী সংগঠনগুলি মজুরি বৃদ্ধি, জনপরিষেবায় বিনিয়োগ, আবাসনের অধিকার এবং বৈষম্য কমানোর দাবি তুলছে। এই দাবিগুলি মূলত সম্পদের বণ্টন এবং রাষ্ট্রের সামাজিক দায়িত্বকে কেন্দ্র করে।
দ্বিতীয়ত, দক্ষিণপন্থী দলগুলি একই পরিস্থিতিকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। তারা আইনশৃঙ্খলার অবনতি, সরকারের দুর্বলতা, অভিবাসন এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সংকটকে সামনে এনে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে। ফ্রান্সে মেরিন ল্য পেনের রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
তৃতীয়ত, আন্দোলনের ভেতরে বামপন্থী সংগঠনের সক্রিয়তা এবং হিংসাত্মক ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে মধ্য-দক্ষিণপন্থী ইউরোপীয় পিপলস পার্টি ও দক্ষিণপন্থী সদস্যরা কয়েকটি দেশের হিংসার জন্য উগ্র বামপন্থীদের দায়ী করে বিতর্ক তুলেছেন। অন্যদিকে, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বৃহত্তর অংশ এবং হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছোট গোষ্ঠীগুলিকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। কোনও নির্দিষ্ট দলের নির্দেশে নয়টি দেশের হিংসা সমন্বিতভাবে পরিচালিত হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনও নেই।
ইউরোপে এখনই কোনও একক বামপন্থী বিপ্লব বা দক্ষিণপন্থী গণঅভ্যুত্থান চলছে, এমন বলা যাবে না। বরং এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বহুমুখী আন্দোলনের পর্ব। বামপন্থী শক্তিগুলি অনেক ক্ষেত্রে মানুষের দাবিকে সংগঠিত করছে; দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলি সেই অসন্তোষ ও অস্থিরতার রাজনৈতিক ফল নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করছে।
আর এখানেই ‘ইউরোপীয় আরব বসন্ত’ প্রশ্নটির গভীরতা। আন্দোলনগুলি যদি শিক্ষা, আবাসন, মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক জোট তৈরি করতে পারে, তাহলে সেগুলি প্রগতিশীল সামাজিক পরিবর্তনের পথ খুলতে পারে। কিন্তু আন্দোলনের ক্ষোভ যদি প্রধানত হিংসা, নিরাপত্তাহীনতা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের দিকে মোড় নেয়, তাহলে তার সুফল দক্ষিণপন্থী শক্তির ঘরে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। শেষ পর্যন্ত কোন শক্তি এগিয়ে থাকবে, তা নির্ধারণ করবে শুধু রাজপথে কত মানুষ নামছেন তা নয়, বরং কে তাঁদের অসন্তোষের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিতে পারছে এবং সেই ব্যাখ্যাকে কার্যকর কর্মসূচিতে রূপ দিতে পারছে।
রাজপথে নামা তরুণেরা যদি মনে করেন, তাঁদের জন্য ভবিষ্যতের দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তাহলে তাঁদের ক্ষোভকে শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখা যাবে না। সেটি হবে রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে তৈরি হওয়া গভীর আস্থার সংকটের প্রকাশ। আর সেই সংকটের সমাধান না হলে আজকের পৃথক বিক্ষোভ আগামী দিনে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। ইউরোপের সামনে এখন সেই সম্ভাবনাই সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা আরব বসন্তের পুনরাবৃত্তি ঘটুক বা না ঘটুক, জনতার ক্ষোভকে উপেক্ষা করে কোনও রাজনৈতিক ব্যবস্থাই দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকতে পারে না।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম