মাদারীপুর প্রতিনিধি: কৈশোরে মেধার পূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করতে শুধু পরীক্ষার ফল কিংবা আর্থিক অসচ্ছলতা নয়, শিক্ষার্থীদের আগ্রহ, মেধা, মানবিকতা, পরিবেশ সচেতনতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও বাস্তবমুখী দক্ষতার উপর গুরুত্ব দিয়ে মাদারীপুরের রাজৈরে চালু হচ্ছে আলোকবর্তিকা ও অগ্রদূত নামে ‘মতিয়ার মাস্টার–শান্তি শিক্ষাবৃত্তি’। এ বৃত্তির আওতায় শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার সহায়তার পাশাপাশি প্রকৃতি সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, গণিত, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা করা হবে।
শনিবার (৩১অক্টোবর) দুপুরে রাজৈর উপজেলার ইশিবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে এ শিক্ষাবৃত্তি কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোখসানা খাইরুন নেছা। তিনি বলেন, শিক্ষার মাধ্যমে সার্বিক বিকাশে এই বৃত্তির ধারণা ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হতে পারে। প্রচলিত শিক্ষাবৃত্তির বাইরে শিক্ষার্থীদের মানবিকতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও বাস্তবমুখী শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলার এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের উদ্যোগ দেশের অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়বে। এ উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
শিক্ষাবৃত্তিটির মূল দর্শন হলো—শিক্ষা যেন কেবল পাঠ্যবই ও পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে যা শিখবে, তা যেন গবেষণা করে বাস্তব জীবনে কাজে লাগাতে পারে। প্রকৃতি, পরিবার, পরিবেশ, সমাজ ও মানুষের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ তৈরি করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
আয়োজকদের মতে, মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে আনন্দময়, অভিজ্ঞতাভিত্তিক ও মানবিক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার সুযোগ তৈরি করা হবে। বিদ্যালয়ে পুষ্টিবাগান, ছাদবাগান, মাটিবিহীন পদ্ধতিতে হাইড্রোপনিক চাষ, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প, আবহাওয়া ও জলবায়ু পর্যবেক্ষণ, দুর্যোগ প্রস্তুতি, প্লাস্টিক বর্জ্য কমানো, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কার্যক্রমে যুক্ত করা হবে তাদের।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজৈর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ননীগোপাল। সভাপতিত্ব করেন ইশিবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কাউসার হোসেন। বক্তব্য দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম বারী ও বাদল নবীন করিম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন শিক্ষাবৃত্তির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মনিরা পারভীন। এ সময়ে প্রয়াত মতিয়ার রহমান মাস্টারের সহধর্মিণী মাহমুদা রহমান এবং তাঁর সন্তান স্বপ্না, রত্না, মুন্নি, শিমুল, তিন্নি ও শাকিল উপস্থিত ছিলেন। সমাপনী বক্তব্য দেন মতিয়ার রহমান মাস্টারের সন্তান ও বাগেরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং শিক্ষাবৃত্তির অন্যতম উদ্যোক্তা মহিদুর রহমান।
শিক্ষাবৃত্তির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মনিরা পারভীন জানান, শিক্ষার্থী নির্বাচনে শুধু আর্থিক অসচ্ছলতা এবং পরীক্ষার ফলাফল নয়, পাশাপাশি প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে ভূমিকা, জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, গণিত ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষতা এবং ভাষা ও যোগাযোগের সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা, সহযোগিতা, নেতৃত্ব ও সমস্যা সমাধানের মানসিকতা গড়ে তোলাও এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
এ শিক্ষাবৃত্তির কার্যক্রম পরিচালিত হবে দুটি ধারায়। এর একটি ‘অগ্রদূত শিক্ষাবৃত্তি’। এটি মূলত গ্রাম ও সমাজভিত্তিক। এ ধারায় সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি শিক্ষা কার্যক্রমে সহায়তা করা হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে পুষ্টিবাগান তৈরি, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্য সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং দুর্যোগকালীন সহায়তার মতো সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অন্য ধারাটি ‘আলোকবর্তিকা শিক্ষাবৃত্তি’। এটি বিদ্যালয় ও শ্রেণিকক্ষভিত্তিক কার্যক্রম। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য এ ধারায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনে গুরুত্ব দেওয়া হবে। দলগত কাজ, বিজ্ঞান প্রকল্প, পরিবেশ সংরক্ষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্কাউটিং এবং ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা হবে।
এ উদ্যোগে ‘পিয়ার লার্নিং’ বা সহপাঠীর মাধ্যমে শেখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। এতে তুলনামূলকভাবে ভালো করা শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকা সহপাঠীদের সহযোগিতা করবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা গড়ে উঠবে। প্রতিযোগিতার পাশাপাশি একে অপরকে এগিয়ে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করাই এ পদ্ধতির লক্ষ্য।
আয়োজকরা জানান, প্রতি বছর জানুয়ারি মাস থেকে শিক্ষাবৃত্তির আবেদন গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। বছরজুড়ে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শিক্ষা, পরিবেশ ও সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নেবে। অক্টোবর মাসে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও স্মারক দেওয়া হবে। তবে স্বীকৃতি পাওয়ার মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকবে না; শিক্ষার্থীরা সারা বছর বিভিন্ন প্রকল্প ও উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
অনুষ্ঠানে শতাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, ‘মতিয়ার মাস্টার–শান্তি শিক্ষাবৃত্তি’ শিক্ষার্থীদের শুধু ভালো ফলাফল এটা অর্জনেই নয়, বরং দায়িত্বশীল, মানবিক, পরিবেশবান্ধব ও দক্ষ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করবে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব