মো. রুবেল হোসাইন: নদী, খাল, বিল ও জলাভূমিতে সমৃদ্ধ বাংলাদেশে দিন দিন তীব্র হচ্ছে নিরাপদ পানির সংকট। কোথাও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় অচল হয়ে পড়ছে নলকূপ, কোথাও লবণাক্ততা ও আর্সেনিক দূষণে পানযোগ্য পানির উৎস সংকুচিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত পানি উত্তোলন, নদী দূষণ ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ এখনো নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে এ সংকট আরও প্রকট।
রাজধানীতেও কমছে পানির স্তর
ঢাকায় পানির চাহিদার বড় অংশ মেটানো হয় ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে। অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামছে। ফলে অনেক এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন করতে হচ্ছে এবং পানি সরবরাহের ব্যয় বাড়ছে।
অন্যদিকে, নদীর পানি শোধন করে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ থাকলেও দূষণ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তা প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। ফলে রাজধানীর পানির চাহিদা মেটাতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা এখনো অনেক বেশি।
উপকূলে লবণাক্ততার থাবা
খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা ও পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানির সংকট দীর্ঘদিনের। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় এসব অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে।
খুলনার পাইকগাছা, কয়রা ও দাকোপ এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনির বহু মানুষকে সুপেয় পানির জন্য দূরবর্তী উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কোথাও পুকুরের পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে, কোথাও আবার পানি কিনে দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে হচ্ছে।
২০২৬ সালের মার্চে বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের বহু এলাকায় নলকূপের পানি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। কিছু এলাকায় গভীর নলকূপ থেকেও নিরাপদ পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
আর্সেনিক ও জীবাণু দূষণের ঝুঁকি
পানির সংকটের পাশাপাশি বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে পানির গুণগত মান। আর্সেনিক, লোহা, লবণাক্ততা ও জীবাণু দূষণের কারণে অনেক পানির উৎস ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
বিবিএস ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের জরিপে দেখা গেছে, খুলনা বিভাগে ৯২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষের ব্যবহৃত গৃহস্থালি পানিতে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। দূষিত পানি পান করলে ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পানির উৎস স্থাপন করলেই সংকটের সমাধান হবে না। পানির গুণগত মান নিয়মিত পরীক্ষা এবং সংগ্রহ ও সংরক্ষণের নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।
কৃষি ও শিল্পে বাড়ছে পানির চাপ
বাংলাদেশে কৃষি সেচের জন্য বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হয়। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত সেচের কারণে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। ফলে কৃষকদের সেচ ব্যয় বাড়ছে এবং অনেক এলাকায় পানির প্রাপ্যতা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য নদী ও জলাশয়ে ফেলায় পানির দূষণও বাড়ছে। এতে একদিকে জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে মানুষের ব্যবহারযোগ্য পানির উৎস কমে যাচ্ছে।
সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
পানি সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে—
- ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ।
- নদী, খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ।
- উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও পানি শোধনাগার স্থাপন।
- কৃষিতে পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তির ব্যবহার।
- নিরাপদ পানির প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৬ নম্বর লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, এ লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে পানি ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে।
পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে পানির সংকট কেবল পানির অভাবের সমস্যা নয়; এটি নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা, সুষম বণ্টন ও টেকসই ব্যবস্থাপনার সংকট। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এই সংকট জনস্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব