রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১৩ লাখ রোহিঙ্গার কারণে সৃষ্ট বহুমাত্রিক সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে এর টেকসই সমাধানে চীনের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জবাবে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে অবহিত করার আশ্বাস দিয়েছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির এই শীর্ষ নেতা। এ সময় দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক যোগাযোগ, কৃষি উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক পর্যায়ে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সাক্ষাৎকালে লিউ হাইশিং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানান। জবাবে প্রধানমন্ত্রীও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং দেশটির প্রিমিয়ার (প্রধানমন্ত্রী) লি ছিয়াংকে শুভেচ্ছা জানান।
বৈঠকে লিউ হাইশিং বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের সময় বাংলাদেশ ও চীনের ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন যুগের সূচনা নিয়ে একটি যৌথ ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। ওই ঘোষণার আলোকে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারণের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে চীনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে জানিয়ে লিউ হাইশিং বলেন, বাংলাদেশের প্রতি চীনের অঙ্গীকার অপরিবর্তিত রয়েছে। ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর ও শক্তিশালী হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সম্ভাবনার প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন চীনের এই প্রতিনিধি।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের জনগণের হৃদয়ে এই সম্পর্ক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ঐতিহাসিক এই বন্ধুত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তা আরও এগিয়ে নেওয়া উভয় দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, নতুন প্রজন্মের হাত ধরে বাংলাদেশ ও চীনের বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ঐতিহ্য আরও সুদৃঢ় হবে।
সাক্ষাৎকালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চীন সফরের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ওই সফরের পর বাংলাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই কর্মসূচি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং দেশের কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
তিনি জানান, বর্তমান সরকারও ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে কৃষক ও সাধারণ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। পাশাপাশি দেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বৈঠকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে দলীয় পর্যায়ে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়। লিউ হাইশিং বলেন, দুই দলের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক করার বিষয়ে চীন আগ্রহী। এ সময় তিনি বিএনপি মহাসচিবের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানান।
এ ছাড়া বৈঠকে বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রতি চীনের সমর্থনের কথা জানান লিউ হাইশিং।
বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ ছিল দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান দেশের অর্থনীতি, সমাজ, জনমিতি ও পরিবেশের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। এই সংকটের কারণে বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তাই রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই সমাধানে চীনের কার্যকর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
জবাবে লিউ হাইশিং বলেন, চীন রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে অবগত রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগের বিষয়গুলো তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে অবহিত করবেন।
বৈঠকে চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি দুই দেশের রাজনৈতিক দল এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
অন্যদিকে, লিউ হাইশিংয়ের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ড. লিউ ইউয়িন, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক পেং শিউবিনসহ দেশটির অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম