আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি :
ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভোররাতের সুনির্দিষ্ট হামলায় পাকিস্তান ও পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের নয়টি জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় দেশের রাজনৈতিক পরিসরে বিরল সংহতির ছবি উঠে এসেছে। শাসক দল থেকে বিরোধী দল পর্যন্ত অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই এই অভিযানের পক্ষে দৃঢ় সমর্থন জানিয়ে সেনাবাহিনীর সাহস ও কৌশলগত নিষ্ঠার প্রশংসা করেছে।
জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ও ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লাহ বলেছেন, ভারত সরকার এবং প্রতিরক্ষা বাহিনী অত্যন্ত সচেতনভাবে এই অভিযান চালিয়েছে যাতে কোনও সামরিক বা বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত না লাগে। শুধুমাত্র জঙ্গি ঘাঁটি এবং লঞ্চপ্যাডকেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
তিনি পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এটি মোটেই সংযত নয়। তার মতে, এই সংঘাতের সূত্রপাত পাকিস্তানের পক্ষ থেকেই হয়েছিল, কারণ তারাই ভারতের নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করেছিল। ভারত সেই উসকানির প্রতিক্রিয়া দিয়েছে মাত্র। তিনি সতর্ক করেন যে, পাকিস্তানকে বুঝতে হবে ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল পহেলগাঁওয়ের ঘটনার সীমিত জবাব। যদি তারা পরিস্থিতিকে আরও বাড়িয়ে তোলে, তবে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
অভিযানের পর পাকিস্তানের পাল্টা গোলাবর্ষণে জম্মু ও কাশ্মীরের পুনছ সেক্টরে বেসামরিক নাগরিকরা আহত হয়েছেন বলে জানান আবদুল্লাহ। তিনি জানান, তিনি নিজে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্রিয় এবং আহতদের জন্য সবরকম সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, পাকিস্তান ও পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর থেকে উৎপন্ন প্রতিটি সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ভারতের জাতীয় নীতি সুস্পষ্ট ও আপসহীন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর এই সাহসিক পদক্ষেপের জন্য কংগ্রেস গর্বিত এবং তাদের অসীম সাহস ও সংকল্পের জন্য অভিনন্দন জানায়। পহেলগাঁও সন্ত্রাসী হামলার দিন থেকেই কংগ্রেস সেনাবাহিনী ও সরকারের পাশে রয়েছে এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতির প্রয়োজনীয়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে।
লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ‘আমাদের সেনাবাহিনীর জন্য গর্বিত’ বলে এক-লাইনের বার্তা দিয়েছেন।
বিজেপি সরকার এই অভিযানের প্রচারেও পিছপা হয়নি। দলীয় ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে সরকারিভাবে প্রেস বিজ্ঞপ্তি শেয়ার করে ‘জয় হিন্দ’ স্লোগান যুক্ত করা হয় এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্যের ভিডিও ফুটেজসহ হামলার দৃশ্যও প্রচার করা হয়, যেখানে লেখা হয়, ‘কহা থা না, চুন চুন কে মারেঙ্গে!’
বিজেপি সভাপতি জে.পি. নাড্ডা বলেন, এই হামলা হল পহেলগাঁওয়ের ঘটনার যথার্থ জবাব। তাঁর কথায়, যারা ভারতের আত্মাকে আঘাত করবে, তারা রেহাই পাবে না। ভারত এখন সজ্জিত ও সংকল্পবদ্ধ—সন্ত্রাসকে উপড়ে ফেলবে। তিনি বলেন, ‘আমরা রক্তাক্ত ক্ষত মুছে ফেলব।’
এই আবহে কয়েকটি দল খানিকটা সংযত অবস্থান নিলেও অধিকাংশ দলই ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে।
শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে গোষ্ঠী) নেতা আদিত্য ঠাকরে বলেন, সন্ত্রাসবাদকে নির্মূল করতে হলে এমন আঘাত হানতেই হবে যাতে আর মাথা তুলতে না পারে।
দলের মুখপাত্র প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী বলেন, ‘ধর্ম জানতে চেয়েছিলে? এখন তোমার কর্মফল ভোগ করো। পাকিস্তানের নাগরিকরা কৃতজ্ঞ হতে পারে ভারতীয় সেনার প্রতি, কারণ তাদের সেনাবাহিনীর মদতে তৈরি হওয়া সন্ত্রাসী পরিকাঠামো ভারত ধ্বংস করেছে। আমরা তোমার ঘরে ঢুকে পরিষ্কার করে এসেছি।’
আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব বলেন, ‘সন্ত্রাস বা বিচ্ছিন্নতাবাদের কোনও স্থান নেই। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রতি আমাদের গর্ব অশেষ।’
AIMIM প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি বলেন, পাকিস্তানে জঙ্গি ঘাঁটির ওপর ভারতীয় সেনার এই সার্জিক্যাল স্ট্রাইককে তিনি স্বাগত জানাচ্ছেন এবং বলেন, পাকিস্তানের ‘ডিপ স্টেট’ বা গোপন সন্ত্রাসী কাঠামোকে কঠিন বার্তা দিতে হবে যাতে পাহালগামের মতো ঘটনা আর না ঘটে।
কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী) বলেছে, তারা আগেই সন্ত্রাসবাদ ও তাদের মদতদাতাদের বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপে সমর্থন জানিয়েছে। একইসঙ্গে দলটি পাকিস্তানের ওপর চাপ তৈরি করে পাহালগামের গণহত্যায় জড়িতদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। তারা ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন জাতীয় সংহতি অটুট রাখা হয়।
তবে একমাত্র দল হিসেবে সিপিআই(এম-এল) লিবারেশন সামরিক উত্তেজনার পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধান খোঁজার আহ্বান জানিয়েছে। দলটি বলেছে, এই অভিযানকে সরকার সুনির্দিষ্ট, সংযত এবং উত্তেজনাহীন পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে, কিন্তু পাকিস্তান দাবি করেছে যে এতে বেসামরিক হতাহত ঘটেছে। ইতিমধ্যেই সীমান্তে গুলি বিনিময় ও বেসামরিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, ফের একবার ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ছায়া ঘনিয়ে আসছে এবং এই পরিস্থিতি ঠেকাতে সবরকম কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে। তারা ভারতের অভ্যন্তরে যুদ্ধোন্মাদনা তৈরি না করতে সরকারকে সতর্ক করেছে এবং একযোগে পাকিস্তান সরকার ও জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন সন্ত্রাসবাদ নির্মূল ও যুদ্ধবিরোধী বার্তায় সক্রিয় ভূমিকা নেয়।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব