আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি : গত এক বছরে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর, তার দল আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা-কর্মী দেশ ছেড়ে ভারতে এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
মোহাম্মদ এ. আরাফাতের মতো উচ্চপদস্থ নেতারা থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মী, সবার জীবনেই এই নির্বাসন এক কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে।
মোহাম্মদ এ. আরাফাত, যিনি শেখ হাসিনার সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, তার জীবন এখন পুরোটাই দলীয় কাজে নিবেদিত। শেখ হাসিনার ভারত নির্বাসনের পর থেকে তার ব্যক্তিগত শখ বা অবসর বিনোদনের কোনো সুযোগ নেই। তার একমাত্র লক্ষ্য, মোহাম্মদ ইউনূসের "অবৈধ" সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা। তিনি বলেন, "হাসিনা চলে যাওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। আমার একটাই লক্ষ্য, বাংলাদেশকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা।
৫১ বছর বয়সী এই সাবেক শিক্ষাবিদ দিন-রাত কাজ করছেন। তার কাছে দিন আর রাতের পার্থক্য ঘুচে গেছে। তিনি বলেন, "আমার কোনো নির্দিষ্ট ঘুমের সময় নেই। কাজ, কাজ আর শুধুই কাজ।" তার কাজ মানেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিকল্পনা করা এবং নির্বাসিত অবস্থায় থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা।
৫ আগস্ট, ২০২৪-এর ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে হয়। এর পর থেকে প্রায় ১৩০০ প্রাক্তন মন্ত্রী, যুবলীগ, ছাত্রলীগের শীর্ষ এবং মধ্যম সারির নেতা-কর্মী ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছেন।
শুধু রাজনীতিবিদই নন, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের সদস্য, সামরিক কর্মকর্তা এবং কূটনীতিকরাও মোহাম্মদ ইউনূস প্রশাসনের "ডাইনি-শিকার" থেকে বাঁচতে দেশ ছেড়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যের মতে, এই সংখ্যা ২০০০ ছাড়িয়ে যাবে।
ভারতে যারা আছেন, তাদের অধিকাংশই কলকাতার নিউ টাউনে বসবাস করছেন। এই দ্রুত বর্ধনশীল উপশহরটি তাদের জন্য আদর্শ বাসস্থান হয়ে উঠেছে। প্রশস্ত রাস্তা, সাশ্রয়ী মূল্যে ভাড়ার ফ্ল্যাট, শপিং মল, জিম এবং বিমানবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় এটি তাদের কাছে খুবই সুবিধাজনক। পরিবার থেকে দূরে থাকলেও তাদের জীবন এক ধরনের ছন্দে বাঁধা পড়েছে: ফজর নামাজ, সকালে ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি, প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ও বিশ্বের অন্যান্য স্থানে থাকা নেতা-কর্মীদের সঙ্গে অনলাইন মিটিং এবং দেশে ফেরার আশা।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে অন্যতম হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গত অক্টোবরে তাকে কলকাতার নিক্কো পার্কে দেখা যাওয়ার খবর বাংলাদেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা থেকে তার দেশত্যাগের খবর কেউ জানত না এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। বর্তমানে নিউ টাউনে ভাড়া করা একটি প্রশস্ত ফ্ল্যাটে তিনি স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে থাকেন। নিয়মিত দলের সহকর্মীরা তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। প্রতি সপ্তাহে তিনি দিল্লি যান দলের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিতে এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করতে। তার ছেলে শাফি মুদ্দাসির খান জ্যোতিকে গত সেপ্টেম্বরে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এক সাবেক সংসদ সদস্যের মতে, আসাদুজ্জামান খান কামাল দলের নেতা-কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখার দায়িত্ব পালন করছেন। তার নিয়মিত বার্তা হলো: "আমরা এখানে অনির্দিষ্টকালের জন্য আরাম করতে আসিনি। আমরা বেঁচে থাকতে এসেছি এবং আগামীকালের লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে এসেছি।"সবাই অবশ্য খান কামালের মতো ব্যস্ত নন। কক্সবাজারের একজন সাবেক সংসদ সদস্য জানান যে তার জীবন এখন একটা ছকে বাঁধা। তিনি অন্য এক সংসদ সদস্যের সঙ্গে একটি ৩-বেডরুমের ফ্ল্যাটে থাকেন, যার ভাড়া মাসে ৩০,০০০ টাকা। সকালে ফজরের নামাজ পড়ার পর তারা দুজনেই কাছের ফিটনেস স্টুডিওতে যান। রান্না করতে অভ্যস্ত না হওয়ায়, রান্নার সময় তারা ঢাকার স্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলে নির্দেশনা নেন। তিনি মজা করে বলেন, "বাংলাদেশে ফেরার পর হয়তো নতুন পেশা হিসেবে আমি একজন শেফ হয়ে যাব।"
দুপুরের খাবারের পর তারা সবাই অনলাইনে বৈঠকে বসেন এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপের পরিকল্পনা করেন। মোহাম্মদ এ. আরাফাত বলেন, "আমরা আমাদের প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও, তাদের জন্য আমরা যেখানেই থাকি না কেন, লড়াই চালিয়ে যাব। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষ আরও ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য এবং আমাদের জাতিকে আবার এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক মুকুটে পরিণত করতে হবে।"
সম্প্রতি কলকাতায় আওয়ামী লীগের একটি "গোপন কার্যালয়" থাকার খবর ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও, সাবেক সংসদ সদস্যরা এই খবর অস্বীকার করেন। তারা বলেন, নিউ টাউনে একটি জায়গা ভাড়া করা হয়েছে, যেখানে সবাই একত্রিত হন। ১,৩০০ নেতা-কর্মী তো আর আসাদুজ্জামান খান কামালের বসার ঘরে বসতে পারেন না। তাই একে অফিস বলাটা বাড়াবাড়ি হবে," বলেন ওই সংসদ সদস্য।
কানাডার অটোয়াতে বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক হারুন আল রশিদও নতুন জীবন শুরু করেছেন। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর তাকে মরক্কো থেকে দেশে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়, কিন্তু তিনি তা করেননি বরং তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ফেসবুকে পোস্ট দেন, যার ফলে তার এবং তার পরিবারের পাসপোর্ট বাতিল করা হয়। তিনি এখন লেখালেখি করে সময় কাটাচ্ছেন এবং তার লেখাগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তার মতামত প্রকাশ করে। তিনি বলেন, "আমি মনে করি ইউনূস বাংলাদেশে এমন অরাজকতা সৃষ্টি করেছেন, যা ২১ শতকে খুব কমই দেখা গেছে। তাই আমি বিশ্বকে জানাতে বাধ্য।" এই লেখার মধ্য দিয়েই তিনি তার প্রথম ফিকশন, একটি ডিসটোপিয়ান উপন্যাস, 'দ্য ম্যাপমেকার্স প্রেয়ার্স'-এর পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছেন।
অন্যদিকে, ঢাকার একজন তরুণ সংসদ সদস্য এই দুঃসময়েও নিজেকে নতুন করে সাজানোর সুযোগ পেয়েছেন। তিনি ডিসেম্বরের পর থেকে নিউ টাউনের একটি ২-বেডরুমের ফ্ল্যাটে একা থাকছেন। তার স্ত্রীর বহুদিনের অনুরোধ ছিল হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করার। ঢাকাতে ব্যস্ততার কারণে তিনি সময় পাননি। কিন্তু এখন তিনি দিল্লিতে গিয়ে হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে নতুন চেহারায় ফিরেছেন। তিনি বলেন, "এমন কঠিন সময়েও নতুন চুল পাওয়াটা ভালো লাগার মতো একটা ব্যাপার।" এই নির্বাসিত জীবনে তারা সবাই ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন, যখন তারা আবার নিজেদের দেশে ফিরতে পারবেন এবং তাদের আদর্শের জন্য লড়াই চালিয়ে যাবেন।
রিপোর্টার্স২৪/এসএন