হিন্দু নির্যাতনের হাত ধরে দেশকে অশান্ত করার ষড়যন্ত্র

হিন্দু নির্যাতনের হাত ধরে দেশকে অশান্ত করার ষড়যন্ত্র

সম্পাদকীয়

এপ্রিল ১৭, ২০২৪ ৮:৫৩ পূর্বাহ্ণ

সিয়াম সারোয়ার জামিল

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক চেষ্টা থাকলেও বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন এখনও বন্ধ হয়নি। বিএনপি ও জামায়াত জোট সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার মাধ্যমে দেশে অস্থিরতার নতুন ষরযন্ত্রে মেতেছে। এরই অঙ্গ হিসাবে নতুন করে ফের শুরু হয়েছে হিন্দুদের ধর্মান্তকরণ। ফলে বিভিন্ন মৌলবাদী সংগঠনের ভয়ে বহু হিন্দু দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। বিদেশ থেকে সামাজিক গণমাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়িয়ে তাদের আরও আতঙ্কিত করে তোলা হচ্ছে।

অসাম্প্রদায়িক চেতনার দেশ বাংলাদেশে নতুন করে ফের শুরু হয়েছে মৌলবাদীদের দাপট। হিন্দুদের ওপর হামলার জন্য ফতোয়া জারি চলছে। ফের শুরু হয়েছে জোর করে ধর্মান্তকরণও। পরিস্থিতি ভয়াবহ চেহারা নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় কোনও ঘাটতি রাখতে না চাইলেও তার দলেরই নীচুতলার কিছু নেতা-কর্মী সম্পত্তির লোভে হিন্দুদের ওপর হামলায় জড়িত বলেও জানা গেছে।

হিন্দু নারীদের বিয়ে করার জন্য বছর দুয়েক আগে ফতোয়া জারি করে বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীস। হিন্দু মেয়েদের বিয়ে করলে তারজন্য পুরষ্কারও ঘোষণা করেছিল সংগঠনটি। বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীসের সভাপতি হিসাবে অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ ফারুক এবং সেক্রেটারী জেনারেল হিসাবে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী ২০২২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী বিজ্ঞপ্তি জারি করে সকল শিবিরদের জন্য নতুন পুরস্কার ঘোষণা করেন। সেই পুরষ্কারে বলা হয়েছিল ব্রাহ্মণ কন্যাকে বিয়ে করলে ৩ লাখ টাকা আর্থিক পুরস্কার দেওয়া হবে। ভারতীয় বাঙালী মেয়েদের জন্য পুরষ্কার ঘোষিত হয়েছিল ২ লাখ টাকা। ৫০ হাজার টাকা ধার্য করা হয়েছিল নমঃশুদ্র মেয়েকে বিয়ে করে মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তকরণের জন্য। গোটা হিন্দু পরিবারকে কেউ ধর্মান্তরিত করতে পারলে তার জন্য পুরষ্কার ঘোষিত হয় ৫ লাখ টাকা। বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীসের এই বিজ্ঞপ্তি জারির পর সামাজিক গণমাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ে। গোপনে চলতে থাকে হিন্দু মেয়েদের তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করার গভীর ষরযন্ত্র। অনেকে ফেসবুককে হাতিয়ার করে নিজের পরিচয় গোপন করে হিন্দু মেয়েদের ফাঁদে ফেলেন। সেই বছর বাংলাদেশে অন্তত ১৫২ জনকে ধর্মান্তকরণ করা হয়।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্তের মতে, বাংলাদেশের হিন্দুরা খুবই আতঙ্কে রয়েছেন। নানাভাবে হিন্দুদের ওপর জামায়াতিদের জুলুমবাজি চলছে। সামাজিক গণমাধ্যমকে হাতিয়ার করে হিন্দু মেয়েদের ফাঁসানো হচ্ছে। সেইসঙ্গে হিন্দুদের ওপর বিভিন্ন জায়গায় মৌলবাদীরা আক্রমণ চালাচ্ছে। বাংলাদেশে এধরনের কাজকর্ম সম্পুর্ণ বেআইনি। স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট এবং ডিজিটাল আইনে এধরনের কাজকর্ম শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবু বাংলাদেশে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি এধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। তারা চাইছে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারের নামে দেশে অস্থিরতা তৈরি করতে। যেভাবেই হোক বাংলাদেশ সরকারকে অস্থির করে তোলাই হয়ে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াতের একমাত্র লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যপূরণে তারা বিভিন্ন মৌলবাদী শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ভর করে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। সেই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ও রাজাকার, আল-বদররা পাকিস্তানিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকেও ধ্বংস করতে চেয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অবস্থানের কারণে অসাম্প্রদায়িক চেতনারই জয় হয়। কিন্তু তার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ফের আক্রান্ত হয় দেশের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র। তবে তার সুযোগ্য কন্যা, জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের হাত ধরে সংখ্যালঘুরা ফিরে পান নিজেদের নিরাপত্তা।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসততেই শুরু হয় হিন্দুদের ওপর ব্যাপক হামলা। ২০০১ এর নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট আবারও ক্ষমতায় আসার পর ১৫০ দিনে সারা দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা-ধর্ষণের মতো ১৮ হাজার অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। হামলায় জড়িত ২৬ হাজার ৩৫২ জনের মধ্যে বিএনপির অনেক মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য জড়িত ছিলেন। বহু হিন্দুকে তারা দেশ ছাড়তে বাধ্য করেন। সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি ব্যাপক হারে লুঠপাঠ হয়। জোর করে বাংলাদেশে হিন্দুদের ধর্মান্তকরণে বাধ্য করেন জামায়াত ও বিএনপির নেতারা। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ফের ক্ষমতায় আসতেই সংখ্যালঘুরা তাদের নিরাপত্তা ফিরে পান। দেশ ছাড়ার প্রবণতাও কমতে থাকে।

কিন্তু ইদানিং ফের শুরু হয়েছে সংখ্যালঘুদের ওপর জুলুমবাজি। সামাজিক গণমাধ্যমে ভূয়া পরিচয় দিয়ে হিন্দু মেয়েদের ফাঁসানো হচ্ছে। এছাড়াও বলপূর্বক ধর্মান্তকরণও চলছে। পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ চেহারা নিচ্ছে। হিন্দুরা আওয়ামী লীগকে ভরসা করলেও এই দলেরই কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিগত মুনাফার জন্য সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

গণমাধ্যমের কাছে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০২২ সালে বাংলাদেশে ১৫৪ জন সংখ্যালঘু খুন হয়েছেন। অপহরণ করা হয়েছে ১২৭ জন সংখ্যালঘুকে। ১৫২ জনকে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করা হয়েছে ৪০ জনকে। দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে ৪৪৫টি সংখ্যালঘু পরিবারকে। ১৫ হাজার ১১৫টি পরিবারকে দেশ ছেড়ে যাওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন ১ লক্ষ ৯৫ হাজার ৯৯১টি পরিবার। ১ বছরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর মোট ৯৫৩টি সংগঠিত হামলা হয়েছে। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়েছে ১২৮টি মন্দিরে। ভাঙচুর হয়েছে ৪৮১টি প্রতিমা। ৭২টি মন্দিরে চুরির ঘটনা ঘটেছে।

বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোটের সভাপতি বিধান বিহারী গোস্বামী এবং মহাসচিব সুশান্ত চক্রবর্তীর অভিযোগ, হিন্দুদের ওপর নির্যাতন বন্ধ হয়নি। গায়ের জোড়ে ধর্মান্তকরণও চলছে। গ্রামাঞ্চলে হিন্দুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ফলে বহু হিন্দু দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকে আবার তাদের কন্যা সন্তানকে ভারতে বা অন্যত্র পাঠিয়ে দিচ্ছেন। ধর্মীয় অত্যাচারে অতীষ্ঠ হিন্দুরা। তাদের বাড়িঘর, দৌকানপাঠ, মন্দির থেকে শুরু করে সবই আক্রান্ত। সরকার প্রতিশ্রুতি দিলেও সেই প্রতিশ্রুতি ঠিক মতো পালন করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠছে।

হিন্দুদের সংখ্যা কমছে বাংলাদেশে। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশছাড়ার হার কমলেও এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সর্বশেষ জনগণনার পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৭৪ সালে হিন্দু ১৩ দশমিক ৫ থেকে ২০২২ এ কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক নয় পাঁচ শতাংশে। তবে ২০১১ এর আগের দুই দশকের তুলনায় ১১ থেকে ২২ এই দশবছরে সংখ্যালঘু কমার হার ছিল নিম্নগামী।

জাতীয় সংসদের নির্বাচনের সময়েও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন হিন্দুরা। বিএনপি-জামায়াত জোট জানে, হিন্দুরা আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতি আস্থাশীল। তাই তাদের ওপর হামলাও বেশি হয়েছে। তবু হিন্দুরা প্রায় সবাই মিলেই নৌকার প্রতি তাদের আস্থা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীর হাত শক্ত করেছেন। পরাস্ত হয়েছে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি। কিন্তু তারা পরাস্ত হলেও দেশকে অস্থির করার ষরযন্ত্র বিসর্জন দেয়নি। বরং পাকিস্তানি মদদে তাদের নেতারা বিদেশে বসে বাংলাদেশে অশান্তির তৈরির ছক কষে চলেছে। তাই সংখ্যালঘুদের ওপর এই আক্রমণ আসলে আওয়ামী লীগকে দুর্বল করাই একটি গভীর ষরযন্ত্র। কড়া হাতে এর মোকাবেলা করা জরুরী।

লেখক ও সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *