স্টাফ রিপোর্টার: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় গত আট মাসে অতিরিক্ত ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটসহ অর্থনীতির নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অর্থনৈতিক সংস্কারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) উত্তরায় তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) তৈরি পোশাক খাতের কারখানাগুলোর পরিবেশগত, সামাজিক এবং সুশাসনসংক্রান্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলন।
উপদেষ্টা বলেন, মাতারবাড়ীকে এনার্জি হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে নীতির ধারাবাহিকতা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, অর্থায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা—এই পাঁচটি ক্ষেত্রে সংস্কার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
বিনিয়োগ বাড়াতে পাঁচ বছরের জন্য করের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলোকে সহায়তায় ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।
এ প্যাকেজের ঋণের সুদের হার ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম বলে তিনি উল্লেখ করেন। ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ আরও অনুকূল করতে ভবিষ্যতে সুদের হার কমানোর প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
জ্বালানি খাতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও অনুসন্ধান, এলএনজি ও এলপিজি সরবরাহ এবং ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। জাপান ও চীনের সঙ্গে এফএসআরইউ-সংক্রান্ত উদ্যোগ বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ করেন উপদেষ্টা।
যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পণ্য পরিবহনে রেল যোগাযোগের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্রডগেজ ও মিটারগেজ ব্যবস্থার সমন্বয় এবং চট্টগ্রাম-ঢাকা এক্সপ্রেসওয়ে-সংক্রান্ত প্রকল্পগুলো ২০২৯ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার আশা করছে সরকার।
উপদেষ্টা বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো বিনিয়োগ ও উৎপাদন খাতে অর্থায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এর ফলে করের হার না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানো সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে দক্ষ ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা যাবে।
তিনি ১৯৭৫-পরবর্তী অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনা করে বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, দুর্ভিক্ষ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকটের মতো কঠিন পরিস্থিতি বাংলাদেশ অতীতেও মোকাবিলা করেছে। সে সময় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন আয়ের উৎস তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিভিত্তিক উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়।
তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে ওঠার পেছনেও ঐতিহাসিক উদ্যোগ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি তৈরি পোশাকশিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ দেশের কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির গতিশীলতা বদলে দিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় নারীদের আনুষ্ঠানিক শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বৃদ্ধির বিষয়টিও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।
বর্তমান অর্থনীতির তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব দেশের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ কর্মসংস্থান, শিক্ষা কিংবা প্রশিক্ষণের বাইরে ছিল; এ জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারীর সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ।
তিনি বলেন, সরকার গঠনের পর কৃষিঋণ মওকুফ এবং ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে সরকার।
উপদেষ্টা আরও বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়ক হবে। তার দাবি, স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, পাঁচ বছরে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৫ শতাংশ কমতে পারে।
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাসের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিতুমীর বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত না হলে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এ বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন ধাপে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের প্রস্তুতির সময় বাড়ানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং ২০২৯ সালের মধ্যে এ প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তৈরি পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত (ইএসজি) মানদণ্ড অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, শুধু কম দামে পণ্য উৎপাদন করলেই চলবে না; উৎপাদনব্যবস্থায় জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার, উন্নত কর্মপরিবেশ, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং কার্যকর প্রতিবেদনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এ জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি ছোট কারখানাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া যেন উন্নয়নশীল দেশের উৎপাদন সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে শুল্কবহির্ভূত বাণিজ্যিক বাধা মোকাবিলা এবং সব পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন, বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ও বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনিস রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিকস মোলার।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব