| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

খালেদা জিয়া: বাংলাদেশের রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়

reporter
  • আপডেট টাইম: অগাস্ট ১৭, ২০২৫ ইং | ০৩:৩৬:২৮:পূর্বাহ্ন  |  ১৪৪৮৪০২ বার পঠিত
খালেদা জিয়া: বাংলাদেশের রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়
ছবির ক্যাপশন: সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া

শাহানুজ্জামান টিটু 

আধুনিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নাম এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। গৃহবধূ থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে তার পদার্পণ দেশে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেতা, সর্ব বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন, তার বর্ণাঢ্য জীবন সংগ্রামী নেতৃত্ব ও আপোসহীন চরিত্র তাঁকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। 

বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালে  দিনাজপুর জেলার শহরের মুদিপাড়া এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তার বাবা ইস্কান্দর মজুমদার এবং মা বেগম তৈয়বা মজুমদার। আদি পৈতৃকনিবাস ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের মজুমদার বাড়ী। বাবা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তিন বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়।

১৯৬০ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান বীরউত্তম এর সাথে তার বিয়ে হয়। জিয়া তখন ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। 

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ ও ব্যক্তিগত জীবন

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালানী বাংলাদেশের শহীদ রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়াউর রহমান ছিলেন সম্মুখযোদ্ধা। তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে মুক্তিকামী জাতিকে দিকনির্দেশনা দেন।  পাকিস্তানী সরকারের বিরোধীতা করায় জিয়াকে পরিবার পরিজন ফেলে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিতে হয়। এরফলে এই সময়ে বেগম জিয়াকে এক সংগ্রামী পথে হাটতে হয়েছে দুই শিশু সন্তানকে সাথে নিয়ে। বেগম খালেদা জিয়া তখন ছিলেন একজন সেনা কর্মকর্তার গৃহবধূ। যার দেশ, রাজনীতি এসব বিষয়ে কেনো ধারণা বা অভিজ্ঞতা কিছুই ছিলো না। যুদ্ধের বিভীষিকাময় অবস্থা  ও অনিশ্চয়তার মাঝেও ধৈর্য ও সাহসিকতার পরিচয় দেন তিনি। কখন পাকিস্তানীদের কাছে বন্দী হতে হয়েছেন আবার কখনো শিশু সন্তানদের সাথে নিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন পরিবার পরিজন থেকে বিছিন্ন হয়ে। 

গৃহবধূ থেকে প্রধানমন্ত্রী

১৯৮১ সালের ৩০ মে এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক শাহাদাৎ বরনের পর জাতীয় রাজনীতিতে এক শূন্যতা তৈরি হয়। দলের কঠিনতম সময়ে বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতা কর্মীদের আহ্বানে তিনি ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন।  আর তখন থেখে শুরু বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক জীবন।  ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। বেগম জিয়া এর বিরোধিতা করেন। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় তিনি প্রথমবারের মত বক্তব্য দেন।  বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বেই মূলত বিএনপির পূর্ণ বিকাশ লাভ করে। দলের পূর্নাঙ্গ দায়িত্বগ্রহণের পর দ্রুতই তিনি দলকে শক্ত হাতে নেতৃত্ব দেন। নব্বইয়ের গণআন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরশাসনের পতনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন এবং ১৯৯১ সালে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার নারী নেতৃত্বের ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ। তিনি তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। 

এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ও বেগম খালেদা জিয়া

১৯৮৩ সালের বেগম জিয়ার নেতৃত্বে সাত দলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়। বেগম জিয়া বিএনপিকে নিয়ে ১৯৮৩ এর সেপ্টেম্বর থেকে ৭ দলীয় ঐক্যজোটের মাধ্যমে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সূচনা করেন। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ দফা আন্দোলন চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বাধার সৃষ্টি হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের এই বিশ্বাসঘাতকতার মধ্যেও বেগম জিয়া আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। 

এসময় তিনি এরশাদের নানা প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে আপোসহীন অবস্থানে চলে যান। 

এরপর বেগম জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল, পাঁচ দলীয় ঐক্যজোট আন্দোলন চালায় এবং নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া "এরশাদ হটাও" শীর্ষক এক দফার আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। একপর্যায়ে আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে তখন 

এরশাদ সংসদ ভেঙে দেন এবং পদত্যাগ করেন।  অবশেষে দীর্ঘ আট বছর অবিরাম, নিরলস ও আপোসহীন সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি এবং খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। সেই নির্বাচনে খালেদা জিয়া মোট পাঁচটি আসনে অংশ নিয়ে পাঁচটিতেই জয়লাভ করেন।


বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন

তাঁর দৃঢ় নেতৃত্বে বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। বেগম জিয়ার বর্নাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে কোনো নির্বাচনে সংসদীয় আসনে পরাজিত হননি। তিনি প্রতিটি নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন সংসদীয় ৫টি করে আসনে প্রতিবারই বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশের একমাত্র এবং সবচেয়  জনপ্রিয় নেতা হিসেবে অর্বিভুত হন। কখনো প্রধানমন্ত্রীর আসসনে আসীন হয়েছেন। কখনো বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনে করছেন। তারা সৎ ও সাহসী নেতৃত্বে    গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সুষ্ঠু নির্বাচন ও জনগণের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। 


আপোসহীন সংগ্রামী নেত্রীর জিয়া অরফানেজ দুর্নীতির মামলায় সাজা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার আপোসহীন ভূমিকা তাঁকে এক অদম্য নেত্রীর আসনে বসিয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। জিয়া অরফানেজ দুর্নীতির নামে সাজানো মামলায় (বিএনপির বক্তব্য)  ২০১৮ সালে  ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা স্পেশাল জজ কোর্ট-৫ আদালত তাকে প্রথমে ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং পরে  ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর  উচ্চ আদালত  সেই দণ্ড বৃদ্ধি করে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়, যা ৩০ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে কার্যকর হয়। দীর্ঘ কারাবাস, গৃহবন্দি জীবন, এবং শারীরিকভাবে জীবনমৃত্যু সন্ধিক্ষণে থেকেও তিনি গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের সংগ্রাম থেকে পিছিয়ে আসেননি। তাঁর এই আপোসহীন অবস্থানের কারণে দেশে আবার গণতেন্ত্রর সুবাতাস শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি বেগম খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত পুরোপুরি অব্যাহতি প্রদান করেছেন। 

প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া

প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বেগম খালেদা জিয়া দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি,শিক্ষা খাত, দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন। বিশেষভাবে শিক্ষা খাতে তার অবস্মরনী অবদানের কথা দেশ বিদেশে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিলো। প্রথম বারের মত  প্রাথমিক শিক্ষাকে বিনামূল্যে করা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি কর্মসূচি এবং নারী শিক্ষার প্রসার ছিল তাঁর বড় অর্জন। এছাড়া কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নেও তিনি কার্যকর পদক্ষেপ নেন। তাঁর সময় কৃষিতে ভর্তুকি, সেচের আধুনিকীকরণ ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

বেগম জিয়া শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃত নেত্রী

বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক, কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং বৈশ্বিক ফোরামে সক্রিয় উপস্থিতি তাঁকে আন্তর্জাতিক মহলে সম্মানিত করেছে। তাঁর পরাষ্ট্রনীতি ছিলো সমতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ সার্কের কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি জাতিসংঘে তার ভূমিকার কারণে বাংলাদেশ আর্ন্তজাতিক পরিমণ্ডলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়। 

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের প্রধান এই নেত্রীর দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা,  উন্নয়ন, গণ্তন্ত্র, ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা রক্ষায় তাঁর অবদান চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে। বেগম খালেদা জিয়ার জীবন শুধু একজন নেত্রীর ব্যক্তিগত কাহিনি নয়, এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। গৃহবধূ থেকে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা থেকে সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসন এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার থেকেও আপোসহীন নেত্রীর  এই পথচলা তাঁকে জাতির ইতিহাসে অমর করেছে। তিনি জীবনের পড়ন্তু সময়েও কোনো আপোস না করে  প্রমাণ করেছেন, সত্যিকারের নেতৃত্ব মানে জনগণের পাশে দাঁড়ানো, গণতন্ত্র রক্ষা করা এবং দেশের স্বার্থে দৃঢ় সংকল্পে অটল থাকা।

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪