আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি
রাশিয়ার ভূখণ্ডে এক নজিরবিহীন হামলা চালিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের গতিপথে কৌশলগত মোড় এনে দিয়েছে। রবিবার শত শত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রুশ সামরিক ঘাঁটিগুলিতে ইউক্রেনের সমন্বিত ড্রোন হামলায় ধ্বংস হয়েছে অন্তত ৪১টি কৌশলগত বোমারু বিমান, যার মধ্যে টিইউ-৯৫, টিইউ-২২ এবং এ-৫০ এর মতো অত্যাধুনিক বিমান রয়েছে।
হিসাব বলছে, এটি রাশিয়ার বোমারু বিমান বহরের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি ক্ষতি — যা আধুনিক যুদ্ধে এক বিরল সাফল্য।এই হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে অত্যাধুনিক উল্লম্ব উড্ডয়ন সক্ষম ড্রোন, যেগুলো শিপিং কন্টেইনার থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উড়ে গিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হেনেছে।
ইউক্রেন দাবি করেছে, প্রায় ১৫০টি ড্রোন একযোগে ব্যবহার করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে রাশিয়ার ছয় হাজার কিলোমিটারেরও বেশি গভীরে, তিনটি টাইম জোন অতিক্রম করে হামলা পরিচালিত হয়েছে। এই অভিযানে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলির অস্ত্র বা সরাসরি সমর্থনের কোনও প্রমাণ না থাকলেও, গোয়েন্দা তথ্য, কৃত্রিম উপগ্রহ চিত্র এবং সামরিক লজিস্টিকস ব্যবহারে ইউক্রেন একটি স্বতন্ত্র সক্ষমতা দেখিয়েছে।
এই হামলার তাৎপর্য শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি রাশিয়ার কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেঙে দেয়ার এক বলিষ্ঠ প্রয়াস। বোমারু বিমানগুলো যেসব স্ট্যান্ড-অফ অস্ত্র বহন করে ইউক্রেনের উপর আক্রমণ চালাতো — সেই সক্ষমতা এখন রাশিয়ার হাতে সীমিত। তাই রুশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া কেবল পাল্টা ড্রোন ঢেউ বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যে সীমিত থাকবে না, বরং ইউক্রেনের অভ্যন্তরে কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা আরও জোরদার হতে পারে।
বিশ্লেষকেরা এই হামলাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের 'পার্ল হারবার' হামলার সঙ্গে তুলনা করেছেন — যার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের গতিপথ এক লাফে বদলে গিয়েছিল। তবে পার্থক্য এই যে, এখানে ইউক্রেন একটি যুদ্ধের চতুর্থ বর্ষে পৌঁছে এমন একটি কৌশলগত স্তরে এই অভিযান চালিয়েছে যা শুধু রাশিয়ার সামরিক ভারসাম্য নষ্ট করেনি, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন প্রশ্নের উদ্রেক করেছে।
কেননা, এই হামলার ঠিক আগে ২ জুন ইস্তাম্বুলে শান্তি আলোচনার দ্বিতীয় দফা শুরু হওয়ার কথা, যার প্রথম পর্বে বন্দী বিনিময়ের মতো কিছু অগ্রগতি দেখা গিয়েছিল।অভিযানটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত, সুসমন্বিত এবং গোপনীয়তার চূড়ান্ত নিদর্শন। অ্যাডমিরাল উইলিয়াম ম্যাকরাভেনের বিখ্যাত 'স্পেশাল অপারেশন থিওরি' - সরল পরিকল্পনা, পুনরাবৃত্ত অনুশীলন, গোপনীয়তা, দ্রুততা ও বিস্ময় - এই ইউক্রেনীয় হামলায় মূর্ত হয়ে উঠেছে।
অভিযানে অংশ নেওয়া ড্রোনগুলি রাশিয়ার অভ্যন্তরে চোরাপথে মোবাইল কাঠের কেবিনে পাচার করা হয়েছিল, যেগুলোর ছাদ দূর থেকে খোলা যেত এবং তারপর ড্রোনগুলি উড়ে গিয়ে টার্গেটে নির্ভুল আঘাত করত।এই মুহূর্তে বিশ্বের অধিকাংশ সামরিক বিশ্লেষকই একমত যে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ একটি বৃহত্তর প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সূচনা করেছে — যেখানে ড্রোন এখন আর কেবল গোয়েন্দা নজরদারি নয়, বরং সরাসরি হামলার মুখ্য অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
ছোট, কম খরচের, কিন্তু উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোনগুলো আজ পারমাণবিক হামলাও প্রতিহত করতে সক্ষম বিমানবহর ধ্বংস করতে পারে। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এখন ড্রোন-কেন্দ্রিক, এবং উন্মুক্ত আকাশের নিচে থাকা যেকোনো সামরিক প্ল্যাটফর্মই চরম ঝুঁকির মুখে।এই প্রেক্ষাপটে ভারতের ১৯৭১ সালের অপারেশন জ্যাকপট কিংবা সাম্প্রতিক সিন্দুর অভিযান, কিংবা এমনকি ২০২১ সালে জম্মু বিমান ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার ঘটনা একটি বৃহত্তর বার্তা দেয় — আমাদের বিমান ঘাঁটিগুলিকে আর খোলা আকাশে ফেলে রাখা যাবে না।
প্রতিটি ঘাঁটি বিস্ফোরণ-প্রতিরোধী কাঠামোয় ঢেকে দিতে হবে এবং স্বয়ংক্রিয় অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি দিয়ে সুরক্ষিত করতে হবে। কারণ স্যাটেলাইট ছবি এখন আর কেবল রাষ্ট্রের একচেটিয়া সম্পদ নয় — বেসরকারি সেক্টরের মধ্যেও এগুলোর সহজলভ্যতা বিপুলভাবে বেড়েছে।এই মুহূর্তে রাশিয়া সম্ভাব্য প্রতিশোধ পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। ইউক্রেনে পাল্টা ৪০০-এরও বেশি ড্রোন হামলা তারই প্রাথমিক ইঙ্গিত।
এমনকি ওরেষ্ণিকের মতো হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলাও হতে পারে, যা ঠেকানো কার্যত অসম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় — ইউক্রেনের এই হামলা যুদ্ধের গতি কি সত্যিই ঘুরিয়ে দিতে পারবে? না কি এটি একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ঝাঁকি যা রাশিয়াকে আরও আগ্রাসী করে তুলবে?ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি জেলেনস্কির কথায় প্রতিফলিত হয়েছে কেবল আত্মবিশ্বাস নয়, বরং ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি — এই অভিযান শুধু সামরিক সাফল্য নয়, বরং বিশ্বযুদ্ধের ধারা পাল্টে দেওয়ার মতো কৌশলগত এক ঘটনা, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের আত্মরক্ষার মরিয়া বার্তা এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধের রূপরেখা দুই-ই একসাথে হাজির করেছে।নতুন এই ড্রোন যুগে, রণনীতি এবং প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর মূল চেহারাই বদলে যাচ্ছে।
যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণে আর শুধু সংখ্যাগত শক্তি বা উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন যন্ত্রপাতির একচেটিয়া আধিপত্য নয়, বরং ছোট, স্বল্প-দামের এবং অপ্রত্যাশিত রণকৌশলের গুরুত্ব এখন অনস্বীকার্য। ইউক্রেন প্রমাণ করেছে যে একটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল সামরিক শক্তিও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, গোয়েন্দা তথ্য ও চতুর কৌশলের মাধ্যমে একটি পরাশক্তির উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই ধরণের হামলা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকেই নয়, মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও শত্রুপক্ষকে একপ্রকার বিহ্বল করে তোলে, এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ন্যারেটিভ পাল্টে দিতে সক্ষম হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই হামলার ফলশ্রুতিতে মস্কোর অভ্যন্তরে নিরাপত্তা ও আস্থার সংকট আরও গভীরতর হতে পারে, যা ভ্লাদিমির পুতিনের সরকারের উপর অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়াবে। একই সঙ্গে, পশ্চিমা দেশগুলিও এই ঘটনাকে নজির হিসেবে নিয়ে তাদের সামরিক ঘাঁটি ও কৌশলগত সম্পদগুলিকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে বাধ্য হবে। ইউক্রেনের এই অভিযানে যেমন প্রযুক্তি, তথ্য এবং সৃজনশীলতা একসূত্রে গাঁথা হয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতের যেকোনো সংঘাতে ‘ড্রোন প্রথা’ হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে কার্যকর ও নির্ধারণকারী উপাদান। এটি শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের এক কৌশলগত মোড় নয়, বরং ২১ শতকের যুদ্ধনীতির এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক এবং সভাপতি, সাউথ এশিয়ান ক্লাইমেট চেইঞ্জ জার্নালিষ্ট ফোরাম ( সাকজেএফ)