স্টাফ রিপোর্টার: দেশের ভোজ্যতেলের বাজার আবারও অস্থিরতার মুখে। গত বছরের নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া সিন্ডিকেট-নিয়ন্ত্রিত অস্থিরতা এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ রয়েছে ৫–৬টি কোম্পানির বিরুদ্ধে। বাজার থেকে সয়াবিন তেলের বোতল প্রায় উধাও হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৩৫ টাকা বাড়িয়ে ২১০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার দাম বাড়ালেও থামেনি তাদের কারসাজি। এবার ফের লিটারে ১২ টাকা বাড়াতে নির্বাচিত সরকারকে চিঠি দিয়ে চাপ সৃষ্টি করেছে মালিক সমিতি। সরকার অনুমোদন না দিলেও নিজেরাই নতুন দাম নির্ধারণ করে কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে তারা। একই সঙ্গে নতুন মূল্য কার্যকর না হলে বাজারে সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা।
এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে রোববার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে বসছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি কৃত্রিম সংকট রোধে অভিযান জোরদার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)।
বুধবার সারা দেশে পরিচালিত ৯টি মোবাইল কোর্টে মোট ১ লাখ ৪২ হাজার ১৭৩ লিটার ভোজ্যতেলের অস্বাভাবিক মজুত চিহ্নিত করা হয়েছে। এ সময় সংশ্লিষ্টদের মোট ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। বৃহস্পতিবার র্যাব সদর দপ্তর থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে মিলমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। চিঠিতে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০৭ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমানে সরকার নির্ধারিত মূল্য ১৯৫ টাকা। এছাড়া— ৫ লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১ হাজার ২০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমানে ৯৫৫ টাকা। খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮৫ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাম তেলের দাম ১৬৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭৭ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এ মূল্য সরকারের অনুমতি পাওয়ার আগেই বৃহস্পতিবার থেকে তারা কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর নয়াবাজারে চারটি মুদি দোকানে গিয়ে পাঁচ লিটারের কয়েক বোতল সয়াবিন পাওয়া গেলেও এক লিটারের বোতল পাওয়া যায়নি। রাজধানীর মালিবাগ কাঁচাবাজারেও একই অবস্থা দেখা গেছে।
পাশাপাশি বাড্ডা গুদারাঘাট বাজারে পাঁচ লিটারের বোতল সয়াবিনও পাওয়া যায়নি। আর এসব বাজারে প্রতিলিটার খোলা সয়াবিন কিনতে ক্রেতাদের ২১০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে, যা সরকার নির্ধারিত মূল্য ১৭৬ টাকা। অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে খুচরা বাজারে ক্রেতার কাছ থেকে লিটারে ৩৪ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ৭ এপ্রিল বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির কাওরান বাজার ও শান্তিনগর বাজারে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়েও একই চিত্র দেখতে পেয়েছেন।
নয়াবাজারের মুদি ব্যবসায়ী মো. শাহিন বলেন, কয়েকদিন ধরে কোম্পানির ডিলাররা দোকানে আসছে না। ফোন করেও তাদের পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া গেলেও তারা কোনো অর্ডার নিচ্ছে না।
তিনি বলেন, ডিলাররা জানাচ্ছেন—দাম বাড়বে, এরপর নতুন তেল বাজারে আসবে। আর মূল্য কার্যকর না হলে কোনো কোম্পানি সয়াবিন তেল সরবরাহ করবে না।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ভোক্তার স্বার্থরক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকার এক প্রকার ব্যর্থ ছিল।
তিনি বলেন, যে সময় তেলের দাম বাড়ানোর কথা নয়, সেই সময় অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের চাপে মূল্য বাড়িয়েছে। তখন থেকেই নির্ধারিত মূল্যে বাজারে তেল বিক্রি হচ্ছে না। সে সময় তদারকি হয়নি, এখনো নির্বাচিত সরকারের সময়ও বাজারে কঠোর তদারকি হচ্ছে না।
তার মতে, বাজার ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজিয়ে ভোক্তাকে স্বস্তি দিতে হবে। পাশাপাশি অনিয়ম করে যারা তেলের দাম বাড়াচ্ছে, তাদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।
এ বিষয়ে টিকে গ্রুপের পরিচালক শফিউল আতহার তসলিম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১৩৭০ ডলার, যা আগে ১১০০ ডলার ছিল। তিনি বলেন, যখন ১১০০ ডলার ছিল তখন দেশে দাম সমন্বয় হয়েছে। এখন বিশ্ববাজারে দাম বাড়ায় তা ফের সমন্বয় করতে হবে। কারণ বাজারে কয়েক মাস ধরে লোকশান গুনতে হচ্ছে।
তার দাবি, প্রতিলিটার তেলে কোম্পানিগুলোকে বিভিন্ন সময়ে ১০ থেকে ২০ টাকা লোকসান দিতে হয়েছে এবং হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রোববার তেলের দামের বিষয়ে সরবরাহকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়।
একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দামের বিশ্লেষণ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমান দামই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ কারণে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন নেই বলে মনে করছে মন্ত্রণালয়।
এর আগে গত ১০ নভেম্বর লিটারে ৯ টাকা বাড়ানোর অনুমতি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। ২৪ নভেম্বর তারা আবারও মূল্য সমন্বয়ের সুপারিশ করে। অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে দুবার অনুমতি চাওয়া হলেও মন্ত্রণালয় তখন সাড়া দেয়নি।
এ পর্যায়ে ব্যবসায়ী সংগঠন সরকারকে পাত্তা না দিয়ে অনুমতি ছাড়াই প্রতিলিটারে ৯ টাকা বাড়িয়ে খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৮ টাকায় বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। মোড়কে নতুন দাম উল্লেখ করে বাজারে ছাড়া হয় তেল। তখন ক্রেতাদের বাধ্য হয়ে বাড়তি দামেই তেল কিনতে হয়েছে।
সরকারকে না জানিয়ে নভেম্বরে আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলো ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোয় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তখন ব্যবসায়ীদের শোকজও দেওয়া হয়। পরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠকের পর লিটারে ৬ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সরবরাহ বন্ধের হুমকি বাস্তবায়িত হলে বাজারে নতুন করে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বেড়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়বে। অন্যদিকে সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈঠকের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে বাজার পরিস্থিতির পরবর্তী চিত্র।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে কঠোর নজরদারি, মজুত নিয়ন্ত্রণ এবং সিন্ডিকেট ভাঙতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভোক্তাদের দুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব