চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: তথ্য অধিকার আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান থাকলেও জনগণের কাছে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ সরকারি কার্যভবন-২ প্রাঙ্গণে আঞ্চলিক তথ্য অফিস, পিআইডি, চট্টগ্রামের আয়োজনে ‘আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
বিভাগীয় কমিশনার বলেন, মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে মানুষ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারে। বিপরীতে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যক্তি ও সমাজের পরিকল্পনাকে ব্যাহত করতে পারে। বর্তমানে মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন ও ডিপফেকের মতো বিষয় তথ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, দেশে তথ্য অধিকার নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এর বাস্তবায়নে বিভিন্ন বিধি-বিধান ও অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (GRS) রয়েছে। তথ্য না পাওয়া বা কোনো বিষয়ে অভিযোগের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগও রয়েছে। তবে এসব ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তথ্যের অবাধ প্রবাহ এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
প্রশাসনিক কাঠামো দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক প্রভাবের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তন এলেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর এখনো হয়নি। ফলে আইন ও কাঠামো তৈরি হলেও সর্বত্র তথ্য আদান-প্রদানের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তিনি আরও বলেন, একজন নাগরিক কোনো সরকারি দপ্তরে গিয়ে সেবা সম্পর্কে জানতে চাইলে অনেক সময় কোন কর্মকর্তা বা শাখা তার কাজটি সম্পন্ন করবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানতে পারেন না। একটি আবেদন বা চিঠি এক ডেস্ক থেকে অন্য ডেস্কে ঘুরতে থাকে। এতে নাগরিকের সময় ও শ্রম নষ্ট হয় এবং সরকারি সেবার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, সরকারি দপ্তরগুলো জনগণের সেবা প্রদানের জন্য প্রতিষ্ঠিত। তাই কোনো নাগরিক সেবার জন্য অফিসে এলে তাকে সঠিক ব্যক্তি, শাখা ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সরকারি দপ্তরগুলোকে আরও জনবান্ধব ও সেবামুখী হতে হবে।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, একসময় এটুআইতে ডেটা কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডেটা হাবে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখা যায়, তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে এক ধরনের অনীহা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিগত বাধা রয়েছে। ‘আমরা কেউ কাউকে ডেটা দিতে চাই না’—এ ধরনের মানসিকতা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। তথ্যকে কোনো দপ্তর বা ব্যক্তির নিজস্ব সম্পদ হিসেবে না দেখে জনগণের প্রয়োজনীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
তথ্যকে একটি প্রক্রিয়াজাত বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, কোনো তথ্য মানুষের কাছে সহজবোধ্য ও ব্যবহারযোগ্যভাবে পৌঁছানোর পেছনে একটি প্রক্রিয়া কাজ করে। ধানক্ষেতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ক্ষেতের ধান সরাসরি মানুষের খাবার হয় না; তা কেটে, মাড়াই করে চাল তৈরি, বাজারজাত ও রান্নার পর মানুষের টেবিলে পৌঁছায়। একইভাবে একটি তথ্যও বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের কাছে সহজ ও ব্যবহারযোগ্যভাবে পৌঁছাতে হয়।
তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তোমরা এই কালচারাল চেঞ্জটা নিয়ে আসো, ট্রান্সফরমেশনটা ফিনিশ করো।’ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নেতৃত্বে জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিতকারী প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন ও ডিপফেকের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাও সহজ হবে। এজন্য আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তথ্য ব্যবস্থাপনা ও আদান-প্রদানের সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক তথ্য অফিসের উপপ্রধান তথ্য অফিসার বাপ্পী চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে এবং তথ্য অফিসার জিএম সাইফুল ইসলামের সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম সরকারি কল্যাণ বোর্ডের পরিচালক মো. নিজাম উদ্দিন, চট্টগ্রাম নৌ-বাণিজ্য দপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ও নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন শেখ জালাল উদ্দিন গাজী, বিস্ফোরক পরিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপ্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক ড. মো. আসাদুল ইসলাম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের উদ্ভিদ সংগনিরোধ রোগতত্ত্ববিদ মো. শেখ ফরিদ, চট্টগ্রাম জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক মহেন্দ্র কুমার চাকমা, চট্টগ্রাম বেতারের সহকারী পরিচালক শুভাশীষ বড়ুয়া এবং পিডিবির উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রকিবুল হাসান।
অনুষ্ঠানে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব