লাকসাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধি: কুমিল্লার লাকসামে ছয়তলা পাকা ভবন থাকা সত্ত্বেও দলিলে স্থাপনাবিহীন বাড়ি উল্লেখ করে প্রকৃত মূল্য ও সম্পত্তির বিবরণ গোপনের মাধ্যমে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, লাকসাম উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে চলতি বছরের ৩০ আগস্ট নিবন্ধিত একটি সাফকবলা দলিলে সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য ও ভবনের বিবরণ গোপন করা হয়েছে। কান্দিরপাড় ইউনিয়নের তুতিগঙ্গা গ্রামের হাসমত আলীর ছেলে মকবুল হোসেনের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে।
দলিলের নথি ও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, মনোহরগঞ্জ উপজেলার উত্তরহাওলা গ্রামের মো. রুহুল আমিনের মেয়ে এবং নাঙ্গলকোটের আশীরপাড় এলাকার ওয়াহিদ সোহাগ মজুমদারের স্ত্রী উম্মে তামান্না খরিদসূত্রে মালিকানাধীন সম্পত্তিটি মকবুল হোসেনের কাছে বিক্রি করেন। লাকসাম মৌজার ধোপা পুকুরপাড় এলাকায় জেএল নম্বর ২০৫-এর বিএস খতিয়ান নম্বর ৬৩১ ও ৬৬৭ এবং ৬৮৯ ও ৬৯১ নম্বর দাগে অবস্থিত ২ দশমিক ০৪ শতক জমিসহ ছয়তলা ভবনটির বিক্রয়মূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৫২ লাখ টাকা। তবে নিবন্ধিত দলিলে সম্পত্তির মূল্য দেখানো হয়েছে ৫২ লাখ টাকা। অভিযোগকারীর দাবি, প্রকৃত মূল্যের তুলনায় এক কোটি টাকা কম দেখানোর পাশাপাশি ভবনের বিবরণও গোপন করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, জমিটিতে নির্মিত ছয়তলা পাকা ভবনের নির্মাণকাজ ২০২৩ সালে শেষ হয়। অথচ নিবন্ধিত দলিলে ভবনটির বিবরণ উল্লেখ না করে স্থাপনাবিহীন বাড়ি হিসেবে সম্পত্তিটি দেখানো হয়েছে। এতে সম্পত্তির প্রকৃত শ্রেণি, অবকাঠামো ও মূল্য আড়াল করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
দুদকে দেওয়া লিখিত অভিযোগে প্রকৃত তথ্য ও সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণ, রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে দলিলগ্রহীতা মকবুল হোসেন বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে থাকি। এসব আইন-কানুন সম্পর্কে আমি অবগত নই। দলিল লেখক যেভাবে বুঝিয়েছেন, আমি সেভাবেই সম্মতি দিয়েছি। এ ছাড়া আরও দুজন ক্রেতা রয়েছেন।”
দলিল লেখক মো. শফিকুর ইসলাম রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, দলিলগ্রহীতা সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেননি; বরং সর্বোচ্চ রাজস্ব পরিশোধ করেছেন। তিনি বলেন, “আমার কাজ দলিল করা, তাই করেছি। জায়গায় গিয়ে জমির শ্রেণি যাচাই করা আমার কাজ নয়।”
তবে দলিল লেখকের দায়িত্ব এবং সংশ্লিষ্ট দলিল নিবন্ধনের আগে তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি নিয়ে সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
লাকসাম উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ের দলিল লেখক সমিতির সভাপতি মো. আহসান উল্লাহ মজুমদার বলেন, দাতা ও গ্রহীতার দেওয়া তথ্য এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ভিত্তিতে দলিল লেখক দলিল প্রস্তুত করেন। সাব-রেজিস্ট্রার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে সঠিক পেলে দলিল নিবন্ধন করেন। পক্ষদ্বয় কোনো তথ্য গোপন করলে তার দায় তাঁদের ওপর বর্তায় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে লাকসাম উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার সাজ্জাদুল কবির বলেন, খতিয়ান, নামজারি, জমা-খারিজ ও খাজনার দাখিলাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে সম্পত্তির শ্রেণি ও অন্যান্য তথ্য সঠিক থাকলে এবং কোনো আপত্তি না থাকলে দলিল নিবন্ধনে বাধা থাকে না। তবে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রকৃত মূল্য বা তথ্য গোপন করা হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত হয়েছেন এবং তা গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হবে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দলিল লেখককে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রকৃত তথ্য ও মূল্য গোপন করে দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনটি প্রমাণিত হলে সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের স্বার্থ সংরক্ষণ করাই তাঁর দায়িত্ব বলে জানান তিনি।
রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ