| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

শেরপুরে বিসিআইসি সার ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

reporter
  • আপডেট টাইম: অক্টোবর ১৭, ২০২৬ ইং | ১১:২১:৩৯:পূর্বাহ্ন  |  ১১৯ বার পঠিত
শেরপুরে বিসিআইসি সার ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

শেরপুর প্রতিনিধি: শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অনুমোদিত তালিকায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের ছোট ভাই ও ফুপাতো ভাই, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়কের স্ত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের দলীয় নেতাদের নাম থাকায় এ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তালিকায় জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনে নিহত সবুজ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত এক আসামির নামও রয়েছে।

বাদ পড়া আবেদনকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সার, বীজ ও কীটনাশকের ব্যবসা করে আসা অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের উপেক্ষা করে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠদের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। কয়েকজন আবেদনকারী ও দলীয় নেতার দাবি, অর্থের বিনিময়েও ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নীতিমালা অনুসরণ করেই প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ করা হয়েছে।

উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি সূত্রে জানা গেছে, শ্রীবরদী উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় সার ডিলার নিয়োগের জন্য মোট ৮৯ জন আবেদন করেন। সেখান থেকে ১১টি স্থানের ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ৩২ জনের নাম সুপারিশ করে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে পাঠানো হয়। পরে মন্ত্রণালয় তালিকাটি অনুমোদন দেয়।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান আকন্দ কমিটির সদস্যসচিব এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনীষা আহমেদ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সুপারিশের তালিকা থেকে বাদ পড়া কয়েকজন আবেদনকারীর অভিযোগ, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, নিজস্ব গুদাম, আর্থিক সক্ষমতা ও অন্যান্য শর্ত যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। তাঁদের দাবি, স্থানীয় সংসদ সদস্যের পছন্দের ব্যক্তিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

হত্যা মামলার আসামির নাম নিয়েও বিতর্ক

সুপারিশের তালিকায় রাণীশিমুল ইউনিয়নের ‘মেসার্স আলম ট্রেডার্স’-এর পরিচালক মো. সিদ্দিকুর রহমানের নাম রয়েছে। তিনি জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনে নিহত সবুজ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। তাঁর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুবলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে।

তাঁর নাম ডিলার নিয়োগের তালিকায় আসার পর বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। দলের একাংশের অভিযোগ, অর্থের প্রভাবে ত্যাগী ও যোগ্য নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হয়েছেন। তবে সিদ্দিকুর রহমানের দাবি, তিনি মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন।

এদিকে, মামলার বাদী ও নিহত সবুজের বড় ভাই মো. সাদ্দাম হোসেন আদালতে নারাজি দেওয়ার পর মামলাটি বর্তমানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এ ঘটনায় গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাণীশিমুল ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি খন্দকার মো. আছলাম জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। একই বিষয়ে গত ৪ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর অভিযোগ করেন জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মো. নাঈম হাসান উজ্জল।

জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নাঈম হাসান উজ্জল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর জেল-জুলুম, নির্যাতন সহ্য করে অনেক ত্যাগী কর্মী পথে বসে গেছে। অন্যদিকে সিদ্দিকুর রহমানের মতো ফ্যাসিস্টরা টাকার কুমির হয়েছে। এই সময়েও যদি তারাই অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ পায়, সেটা দুঃখজনক।’

তালিকা প্রকাশের পর শ্রীবরদী পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মো. ফজলুল হক চৌধুরী অকুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন, ‘অভিনন্দন, আমরা সর্বদলীয় লোকদের সারের ডিলার নিয়োগ দিয়েছি। জামাত বাদে।’ তাঁর এ মন্তব্য নিয়োগপ্রক্রিয়ার রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

সংসদ সদস্যের স্বজন ও দলীয় নেতাদের পরিবারের সদস্যদের নাম

অনুমোদিত তালিকায় শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহমুদুল হক রুবেলের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের নাম থাকায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ জোরালো হয়েছে।

খড়িয়া কাজীরচর ইউনিয়নের ‘মেসার্স হক ব্রাদার্স’-এর মালিক সংসদ সদস্যের ছোট ভাই। কুড়িকাহনিয়া ইউনিয়নের ‘নির্মান ট্রেডার্স’-এর মো. হেদায়েতুল ইসলাম ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং সংসদ সদস্যের ফুপাতো ভাই।

এ ছাড়া শ্রীবরদী পৌরসভার ‘মেসার্স লিখি ট্রেডার্স’-এর মাহমুদা আক্তার তারানা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. আব্দুর রহিম দুলালের স্ত্রী। কাকিলাকুড়া ইউনিয়নের ‘জোবায়ের এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক মো. জোবায়ের হাসান ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক। স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা বিএনপির এক শীর্ষ নেতা তাঁর নামে লাইসেন্স করিয়েছেন; যদিও তিনি প্রকৃত ব্যবসার মালিক নন বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।

শ্রীবরদী সদর ইউনিয়নের ‘মেসার্স ইমতিয়াজ মঈন ট্রেডার্স’-এর মনি আক্তারের স্বামী সরকারি চাকরিজীবী বলেও জানা গেছে।

ডিলার নিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ শুধু বাদ পড়া আবেদনকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। দলীয় নেতাদের একাংশও এ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন হারানোর আশঙ্কায় অনেকে প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

অর্থ লেনদেনের অভিযোগ আবেদনকারীদের

সিংগাবরুণা ইউনিয়নের আবেদনকারী ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু রায়হান বাবুল সরাসরি অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, ‘টেহা-পয়সা কম দিবার চাইছিলাম তো, তাই আমাক দেয় নাই। আমি ১৫ লাখ দিবার চাইছিলাম। লিটন ডাবল দিছে, তাই পাইছে।’

তবে তাঁর এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।

অন্য আবেদনকারী শামসুল আরেফিন বলেন, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। যাঁরা ডিলারশিপ পেয়েছেন, তাঁদের যোগ্যতা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

গোশাইপুর ইউনিয়নের আবেদনকারী মো. জাকির হোসেন জানান, নিজস্ব গুদাম ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ডিলারশিপ পাননি। অথচ অন্যরা ভাড়া করা গুদাম দেখিয়েও নিয়োগ পেয়েছেন বলে তাঁর অভিযোগ। তিনি বলেন, ‘আসলে আমার মাল-পানি নাই, লাইসেন্স হবে কীভাবে?’

কাকিলাকুড়া ইউনিয়নের আবেদনকারী ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুন্নবী ফজুও নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ী হয়েও পেলাম না। এখন যাকে দিছে সে ছোট পোলাপান, ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক। তার আর্থিক অবস্থাও ভালো না, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাও নেই। আসলে সে তো চালাতে পারবে না, চালাবে উপজেলার আরেক নেতা।’

যা বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা

ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব মো. মাহমুদুল হাসান আকন্দ বলেন, ‘প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে নীতিমালা অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করে আগ্রহী প্রার্থীদের নাম প্রস্তাব করে জেলা কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে।’

উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও ইউএনও মনীষা আহমেদ বলেন, ‘স্বচ্ছতার সঙ্গে সুপারিশ করা হয়েছে। এটি নিয়োগ কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।’

তবে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য এবং তালিকায় থাকা অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা-ও প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং নিয়োগে নির্ধারিত যোগ্যতা ও নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪