| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

নেপালে বন্যা: হিমালয়ে কী ঘটেছিল, সামনে কী ঝুঁকি

reporter
  • আপডেট টাইম: অগাস্ট ২৭, ২০২৬ ইং | ২৩:৪৯:৫১:অপরাহ্ন  |  ৬১৭ বার পঠিত
নেপালে বন্যা: হিমালয়ে কী ঘটেছিল, সামনে কী ঝুঁকি

রিপোর্টার্স ডেস্ক: নেপালের রাসুয়া জেলায় গত বুধবার (২৬ আগস্ট) ভয়াবহ বন্যায় শত শত মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে বেশ কিছু সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। বিজ্ঞানীরা এখনও খুঁজে দেখছেন, কীভাবে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস এই আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত করেছিল। এরই মধ্যে চীনের তিব্বত অংশে নতুন একটি বাধা হ্রদ তৈরি হওয়ায় ভোটেকোশি নদীতে ফের বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রাসুয়া ছাড়াও নুওয়াকোট, ধাদিং, চিতওয়ান, তানাহুন, গোরখা ও নওয়ালপরাসি ইস্ট জেলায় বন্যায় মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবারের বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে কাজ করছেন বিজ্ঞানী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা।

নেপাল-চীন সীমান্তে কী ঘটেছিল?

বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে রাসুওয়াগাধি সীমান্ত এলাকায় ভোটেকোশি নদীর পানি অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করে। প্রাণ বাঁচাতে মানুষ ছোটাছুটি শুরু করেন। অনেকে প্রবল স্রোতে ভেসে যান।

প্রথমে হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ বিস্ফোরণ বা তুষারধসকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধারণা করা হলেও দিনের বেশির ভাগ সময় সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

রাসুওয়াগাধির কাছ থেকে বন্যা শুরু হয়ে রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিংয়ের বিভিন্ন বসতিতে ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত নেপাল সরকার ২৮৯ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছিল। নিখোঁজ ছিলেন আরও কয়েকশ মানুষ। রাসুয়া থেকে ধাদিংয়ের মধ্যবর্তী এলাকার সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামো বন্যার পানিতে ভেসে গেছে।

নুওয়াকোটের সহকারী প্রধান জেলা কর্মকর্তা কৃষ্ণ প্রসাদ হুমাগাইন কাঠমান্ডুভিত্তিক কান্টিপুরকে বলেন, স্মরণকালের মধ্যে ওই এলাকায় এটাই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা।

তুষারধস নাকি ভূমিকম্প?

স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, বরফ ও পাথরের বিশাল একটি ধস নদীর প্রবাহ আটকে অস্থায়ী বাঁধ তৈরি করেছিল। পরে সেই বাঁধ ভেঙে গিয়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়।

বুধবার নেপাল সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে তিব্বতে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রেকর্ড করে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল গোসাইনকুণ্ড থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে। তবে ভূমিকম্পটি তুষারধসের কারণ হয়েছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।

নেপালি টাইমসে সাংবাদিক কুন্দা দীক্ষিত লিখেছেন, ৭ হাজার ২৪৫ মিটার উচ্চতার লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর ঢালে তুষারধস হয়েছিল।

২০১৫ সালের ভূমিকম্পের সময়ও এই পর্বতে ভয়াবহ তুষারধস হয়েছিল। সে সময় দক্ষিণ ঢাল থেকে নেমে আসা ধসে লাংটাং গ্রাম চাপা পড়ে প্রায় ৩০০ মানুষ নিহত হন।

কুন্দা দীক্ষিতের তথ্য অনুযায়ী, নেপালের ভেতরে অবস্থিত লাংটাং লিরুং থেকে নেমে আসা ধ্বংসাবশেষ নেপাল-চীন সীমান্তের লেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। এতে অস্থায়ী হ্রদ তৈরি হয়। পরে সেই বাধা ভেঙে কাদা ও পাথরসহ প্রবল স্রোত ভোটেকোশি নদীর দিকে ধেয়ে যায়।

কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু গবেষক ও অধ্যাপক রিজান ভক্ত কায়াস্তা বলেন, লেন্দে নদীর প্রবাহ তুষারধসে আটকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

তিনি বলেন, আমরা সন্দেহ করছি, নেপাল অংশে একটি তুষারধস লেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দিয়েছিল। প্রায় একই সময়ে একটি ভূমিকম্প হয়েছিল, তবে সেটি তুষারধসের সূত্রপাত ঘটাতে সহায়তা করেছিল কি না, আমরা এখনো জানি না।

আগে কি কোনো সতর্কতা ছিল?

এ অঞ্চল আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে আগে থেকেই জানা ছিল। গত বছরের ৮ জুলাই ভোটেকোশি নদীতে একই ধরনের আকস্মিক পানি বৃদ্ধি দেখা যায়। নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ পরে জানায়, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে লেন্দে নদীতে একটি হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ বিস্ফোরিত হওয়ায় ওই বন্যা হয়েছিল। সেন্টিনেল স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণেও হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদটি ভেঙে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়।

ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির এক গবেষণায় নেপাল, ভারত ও তিব্বতে ৩ হাজার ৬২৪টি হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত, যার ২১টি নেপালে।

তবে বুধবারের বিপর্যয়ের স্থানে বরফ-পাথরের ধসের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পূর্বাভাস ছিল না।

বিজ্ঞানীরা কী বলছেন?

নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটিও বরফ ও পাথরের ধসকে বন্যার প্রধান কারণ হিসেবে দেখছে। প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণে রাসুওয়াগাধি সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে বড় ধরনের একটি ধসের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ধসের ধ্বংসাবশেষ লেন্দে নদীতে পড়ে কাদামাটি ও পাথরবাহী বন্যার সৃষ্টি করে।

আইসিআইএমওডির বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করছেন, নদীর সংকীর্ণ কোনো অংশে ধ্বংসাবশেষ জমে সাময়িকভাবে নদীর প্রবাহ বন্ধ করে ‘ল্যান্ডস্লাইড ড্যাম’ তৈরি হয়েছিল কি না।

সংস্থাটি জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের ভিডিও ও প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর ভোটেকোশি নদীর শাখা লেন্দে নদীতে পড়ে নদীর প্রবাহ আটকে দিয়েছিল।

বন্যার স্রোত ছিল অস্বাভাবিক দ্রুত ও শক্তিশালী। আইসিআইএমওডির তথ্য অনুযায়ী, গালছিতে মাত্র ৩০ মিনিটে ত্রিশূলী নদীর পানি ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়। একই সময়ে মালেখুতে পানি বাড়ে প্রায় ৭ মিটার।

আইসিআইএমওডির রিমোট সেন্সিং ও জিওইনফরমেশন সহযোগী সার্থক শ্রেষ্ঠ বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য নেপাল অংশে সংঘটিত তুষারধসকেই বন্যার প্রধান কারণ হিসেবে নির্দেশ করছে।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত প্রমাণ বলছে, সিয়াপ্রুবেশির ওপরের দিকে একটি তুষারধস নদীর প্রবাহ আটকে দিয়েছিল এবং এরপরই বন্যা হয়। পুরো চিত্রটি পরিষ্কার হতে আরও এক-দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

চীনা কর্তৃপক্ষের দেওয়া স্যাটেলাইট ছবির প্রাথমিক পর্যালোচনাতেও তুষারধসটি নেপালের অংশে ঘটেছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আইসিআইএমওডি জানিয়েছে, তিব্বত অংশে এত বড় বন্যা সৃষ্টির মতো কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা চীনের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় ধরা পড়েনি।

আবারও বন্যার আশঙ্কা আছে কি?

বিজ্ঞানীরা নতুন করে বিপদের আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না। নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং বুধবার বিকেলে জানান, লেন্দে নদীর পানি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

কায়াস্তা বৃহস্পতিবার জানান, শুরুতে আশঙ্কা ছিল উজানে আরও বড় কোনো জলাধার তৈরি হয়েছে কি না। তবে এমন হ্রদ তৈরি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো যথেষ্ট তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

এদিকে মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়ার কারণে ওই এলাকার স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণও ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছে আইসিআইএমওডি।

ঝুঁকি এখনো রয়েছে জানিয়ে কায়াস্তা বলেন, তাপমাত্রা বাড়লে হিমবাহ গলার সম্ভাবনা বাড়ে, বরফ ও পাথর ভেঙে পড়া এবং হিমালয়ে তুষারধসের আশঙ্কাও বাড়ে। তবে পরবর্তী ঘটনা ঠিক কোথায় ঘটবে, তা আমরা বলতে পারি না। বিজ্ঞানীরা হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রেখেছেন।

চীনের অংশে কী ঘটছে?

বিপর্যয়ের ভাটির দিকে চীনা অংশে আরেকটি সম্ভাব্য বিপজ্জনক পরিস্থিতির খবর পাওয়া গেছে। চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিব্বতে ছটচেন নদী ও পুরুপে সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে একটি বড় বাধা হ্রদ তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত এতে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমা হয় এবং হ্রদ থেকে পানি বের হতে শুরু করে বলে গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে।

চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরবর্তী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি হ্রদটিতে প্রবেশ করতে পারে। এতে প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চীনা কর্তৃপক্ষ হ্রদটি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে এবং বাঁধ ভেঙে গেলে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা জানতে বন্যার সিমুলেশন চালাচ্ছে। একই সঙ্গে জরুরি সহায়তা ও উদ্ধার তৎপরতার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।

ছটচেন ও পুরুপে নদীর উৎপত্তি তিব্বতে। পরে নদী দুটি একত্রিত হয়ে নেপালে প্রবেশ করেছে, যেখানে নদীটির নাম ভোটেকোশি। ভোটেকোশি ত্রিশূলী নদীর প্রধান উজানি উপনদী। তথ্যসূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪