| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

হুথিরা যেভাবে স্থানীয় বিদ্রোহী থেকে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিতে পরিণত হলো

reporter
  • আপডেট টাইম: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬ ইং | ২০:৩৫:০২:অপরাহ্ন  |  ৩৯০ বার পঠিত
হুথিরা যেভাবে স্থানীয় বিদ্রোহী থেকে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিতে পরিণত হলো

আশিস গুপ্ত: ইয়েমেন আবারও এমন এক যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে, যার অভিঘাত শুধু আরব উপদ্বীপে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ২০২২ সালের জাতিসংঘ-সমর্থিত যুদ্ধবিরতির পর কয়েক বছর ইয়েমেনের প্রধান যুদ্ধরেখাগুলি তুলনামূলকভাবে স্থির ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে দিয়েছে। হুথি বাহিনী পশ্চিম ইয়েমেনের উপকূল বরাবর অগ্রসর হয়ে মোখা বন্দর দখল করেছে এবং দক্ষিণ লোহিত সাগরের গ্রেটার ও লেসার হানিশ দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে । 

একই সময়ে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনী পাল্টা অভিযান চালাচ্ছে; মারিব, আল-জাওফ, হাজ্জাহ, তাইজ, লাহজ, আল-বায়দা ও সা’দাহ-সহ একাধিক ফ্রন্টে লড়াই তীব্র হয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষ দূত হান্স গ্রুন্ডবার্গ সতর্ক করেছেন যে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেন এখন বৃহৎ আকারের সংঘাতে ফিরে যাওয়ার সবচেয়ে গুরুতর ঝুঁকির মুখে।

এই নতুন সংঘাতের গুরুত্ব বোঝার জন্য হুথিদের শুধু ‘ইরানের মদতপুষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠী’ হিসেবে দেখলে চলবে না। হুথি আন্দোলনের শিকড় ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসে। কিন্তু গত দুই দশকে সেই স্থানীয় বিদ্রোহ ধীরে ধীরে এমন একটি সামরিক-রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যার হাতে এখন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সমুদ্রপথে আক্রমণের সক্ষমতা এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে। ফলে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আজ একই সঙ্গে একটি রাষ্ট্রীয় সংকট, সৌদি-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সম্প্রসারিত ফ্রন্ট এবং বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সমস্যা।

হুথিদের ইতিহাস আসলে উত্তর ইয়েমেনের জায়দি শিয়া সমাজের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জায়দিবাদ ইয়েমেনে বহু শতাব্দী ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয়-রাজনৈতিক ঐতিহ্য। ১৯৬২ সালের ইয়েমেন বিপ্লব (যা ২৬ সেপ্টেম্বর বিপ্লব নামেও পরিচিত) মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং আধুনিক ইয়েমেনের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী রক্তক্ষয়ী ঘটনা। এই বিপ্লবের মাধ্যমে উত্তর ইয়েমেনে শতবর্ষ পুরনো একনায়কতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬২ সালের বিপ্লবের আগে উত্তর ইয়েমেনে জায়দি ইমামত দীর্ঘদিন রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রেখেছিল। প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর সেই পুরনো রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে যায়। পরবর্তী কয়েক দশকে সৌদি আরবের প্রভাব, সালাফি মতাদর্শের বিস্তার এবং উত্তর ইয়েমেনের জায়দি অঞ্চলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রান্তিকতা নতুন অসন্তোষ তৈরি করে।

১৯৯০-এর দশকে হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুথির নেতৃত্বে একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পুনর্জাগরণমূলক আন্দোলন গড়ে ওঠে। সংগঠনটির নাম পরে হয় ‘আনসার আল্লাহ’, যদিও তার নেতৃস্থানীয় পরিবারের নাম অনুসারে আন্তর্জাতিকভাবে এটি ‘হুথি’ নামে পরিচিত হয়। শুরুতে আন্দোলনের মূল দাবি ছিল জায়দি পরিচয়, স্থানীয় অধিকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরোধিতা। সেই সময় এটি সরাসরি ইরানের তৈরি কোনো সংগঠন ছিল না। বরং এর জন্ম ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যেই। ইউএস ইনস্টিটিউট অব পিসও হুথি আন্দোলনের উৎপত্তিকে ১৯৯০-এর দশকের জায়দি ধর্মীয় পুনর্জাগরণের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

২০০৪ সালে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর সরকারের সঙ্গে হুথিদের সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়। হুসেইন আল-হুথি নিহত হওয়ার পর আন্দোলনটি তাঁর পরিবার ও সহযোগীদের নেতৃত্বে আরও সামরিক চরিত্র লাভ করে। ২০০৪ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ইয়েমেন সরকার ও হুথিদের মধ্যে একাধিক দফায় যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধগুলির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সৌদি আরবের সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। হুথিরা উত্তর ইয়েমেনের সা’দাহ অঞ্চলে শক্ত ঘাঁটি তৈরি করতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে নিজেদের একটি কার্যকর সশস্ত্র শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

২০১১ সালের আরব বসন্ত ইয়েমেনের রাজনৈতিক সমীকরণকে আমূল বদলে দেয়। দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতা ছাড়েন। তাঁর জায়গায় আবদরাব্বুহ মনসুর হাদি একটি অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থার নেতৃত্ব নেন। কিন্তু নতুন ইয়েমেন রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে স্থিতিশীল করতে পারেনি।

২০১৩-১৪ সালের জাতীয় সংলাপেও বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি, সংবিধান এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে মতবিরোধ কাটেনি। এই রাজনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নেয় হুথিরা। ২০১৪ সালে তারা রাজধানী সানা দখল করে। পরবর্তী সময়ে তারা দক্ষিণের দিকে অগ্রসর হয়ে এডেনের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। প্রেসিডেন্ট হাদি দেশ ছেড়ে পালিয়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নেন এবং আন্তর্জাতিক সামরিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান। এর পরেই ইয়েমেনের স্থানীয় রাজনৈতিক সংকট আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হয়।

২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট হুথিদের বিরুদ্ধে বিমান অভিযান শুরু করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিলেও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটকে গোয়েন্দা তথ্য, লজিস্টিক, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সামরিক সহায়তা দিয়েছিল। ফলে ইয়েমেনের যুদ্ধ ক্রমশ প্রক্সি যুদ্ধের চরিত্র পেতে থাকে। একদিকে হুথি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার ও বিভিন্ন স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী; তাদের পেছনে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পৃথক স্বার্থ; আর এর বিপরীতে ইরানের ক্রমবর্ধমান সমর্থন। তবে হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রেও সরলীকরণ বিপজ্জনক।

ইরান যে হুথিদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে এ বিষয়ে বহু আন্তর্জাতিক গবেষণা রয়েছে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক স্বাধীন ও অরাজনৈতিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (Council on Foreign Relations - CFR)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান হুথিদের প্রধান সামরিক পৃষ্ঠপোষক এবং ২০১৪ সালের মধ্যে হুথিদের কাছে ইরানি অস্ত্র পৌঁছানোর বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যথেষ্ট ঐকমত্য রয়েছে।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে ইয়েমেনের ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্স একটি বড় অস্ত্রের চালান আটক করার দাবি করেছিল; মার্কিন গবেষণা সংস্থাগুলিও হুথিদের ইরানি সহায়তার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে। কিন্তু ‘হুথিরা ইরানের প্রক্সি’ এই একটি বাক্য দিয়ে সম্পর্কটির সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা যায় না। হুথিদের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে এবং তাদের সংগঠন ইয়েমেনের স্থানীয় সামাজিক ও উপজাতীয় কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। CFR-এর বিশ্লেষণেও হুথিদের ‘informal partner’ হিসেবে বর্ণনা করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে; অর্থাৎ ইরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক থাকলেও তারা হিজবুল্লাহর মতো সরাসরি তেহরানের নিয়ন্ত্রণাধীন সংগঠন নয়।

২০১৫ থেকে ২০২১ পর্যন্ত সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান অভিযান হুথিদের পরাজিত করতে পারেনি। বরং যুদ্ধ ইয়েমেনকে ভয়াবহ মানবিক সংকটে ঠেলে দেয়। খাদ্য, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, পানীয় জল, অবকাঠামো এবং অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। ২০১৮ সালে হোদেইদা বন্দর ঘিরে যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক চাপ এতটাই বাড়ে যে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় স্টকহোম চুক্তি হয়। যুদ্ধের প্রধান ফ্রন্টগুলিতে শেষ পর্যন্ত সাময়িক স্থবিরতা আসে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যে যুদ্ধবিরতি হয়, সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে পরে শেষ হয়ে গেলেও তার পরও বড় আকারের যুদ্ধ অনেকটা থেমে ছিল। ইয়েমেনের রাজনৈতিক মানচিত্র অবশ্য বদলায়নি। হুথিরা সানা এবং উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেনের ঘনবসতিপূর্ণ বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দক্ষিণ ও পূর্বের কিছু অংশে সীমিত কর্তৃত্ব ধরে রাখে। ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই বিভাজনই ছিল ইয়েমেনের বাস্তব রাজনৈতিক কাঠামো।

তারপর আসে ২০২৩ সালের গাজা যুদ্ধ। হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলা এবং ইসরায়েলের গাজা অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুন করে নাড়িয়ে দেয়। হুথিরা নিজেদের ‘ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের’ অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে। তারা দাবি করে, ইসরায়েল বা তার মিত্রদের সঙ্গে যুক্ত জাহাজই তাদের লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তবে বহু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ এই হামলার ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। ২০২৩ সালের শেষ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হুথি হামলা লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন ইয়েমেনে হুথি ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায়। কিন্তু সামরিক আঘাতও হুথিদের সমুদ্রপথে হামলার সক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি। বরং ইয়েমেনের স্থানীয় যুদ্ধ এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়। লোহিত সাগর দিয়ে ইউরোপ-এশিয়ার বাণিজ্য, সুয়েজ খাল এবং আরব উপসাগরের জ্বালানি পরিবহণ সবকিছুর সঙ্গে ইয়েমেনের যুদ্ধ যুক্ত হয়ে যায়।

২০২৫ সালে হুথিদের লোহিত সাগর অভিযান কিছুটা থেমেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের আঞ্চলিক সংঘাত আবার পরিস্থিতিকে বদলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধও নতুন করে সক্রিয় হয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষ দূতের আগস্টের সতর্কবার্তা ছিল ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেন এখন বড় আকারের সংঘাতে ফিরে যাওয়ার সবচেয়ে গুরুতর ঝুঁকিতে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার হুথি অবস্থানে বিমান হামলা শুরু করে; পশ্চিম ইয়েমেনের তাইজ ও হোদেইদা অঞ্চলে অন্তত ১৫টি হামলার কথা ইয়েমেনি সামরিক সূত্র জানিয়েছে। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়। হুথিরা পশ্চিম উপকূল বরাবর দ্রুত অগ্রসর হয়ে মোখা দখল করে। মোখা শুধু ঐতিহাসিক বন্দর নয়; এটি বাব আল-মান্দাবের দিকে যাওয়া সামুদ্রিক করিডরের কাছে অবস্থিত। এরপর গ্রেটার হানিশ ও লেসার হানিশ দ্বীপপুঞ্জের দখল তাদের সামুদ্রিক কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।

এখানেই ইয়েমেনের যুদ্ধের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট। বাব আল-মান্দাব হলো লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল। এই সরু জলপথ দিয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহণ হয়। ২০২৬ সালে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও যখন গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তখন বাব আল-মান্দাবের ওপর চাপ বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য দ্বৈত ঝুঁকি তৈরি করছে।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সাম্প্রতিক আলোচনাতেও বাব আল-মান্দাবের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এর প্রভাব শুধু জাহাজ চলাচলে নয়। সুয়েজ খালের ওপরও এর সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সংকটের সময় জাহাজগুলিকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে যেতে হলে পরিবহণের সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে যায়। মিশরের সুয়েজ খাল থেকে আয়ও কমে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ সালে সুয়েজ খালের রাজস্ব প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার কমেছিল। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো সৌদি আরবের অবস্থান। ২০১৫ সালে যে সৌদি আরব হুথিদের সামরিকভাবে পরাজিত করার জন্য বিশাল জোট গঠন করেছিল, আজ সেই সৌদি আরব নিজেই ইয়েমেনের নতুন যুদ্ধের চাপের মুখে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি হুথি হামলা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন শহর ও স্থাপনায় পৌঁছেছে বলে রিপোর্ট হয়েছে। সৌদি নেতৃত্ব এখন মিশর সহ আঞ্চলিক দেশগুলির সমর্থন চাইছে।

এখানে ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতার বৃহত্তর প্রশ্নটি আবার সামনে আসে। ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিম অংশে শক্তিশালী হুথি রাষ্ট্রসদৃশ প্রশাসন এবং বাব আল-মান্দাবের কাছে তাদের সামরিক উপস্থিতি ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হতে পারে। বিশেষ করে যখন হরমুজ প্রণালি নিয়েও একই সময়ে সংঘাত চলছে, তখন আরব উপদ্বীপের দুই প্রান্তের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক chokepoint একই বৃহত্তর সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। তবে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে হুথিদের নিজস্ব ইয়েমেনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে; তাদের প্রতিটি সামরিক সিদ্ধান্তকে তেহরানের সরাসরি নির্দেশ হিসেবে ব্যাখ্যা করার মতো প্রকাশ্য প্রমাণ সব ক্ষেত্রে নেই।

অন্যদিকে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারও একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তি নয়। Presidential Leadership Council বা পিএলসি-র মধ্যে বিভিন্ন আঞ্চলিক, উপজাতীয় ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর স্বার্থ রয়েছে। দক্ষিণ ইয়েমেনের স্বাধীনতার দাবিদার Southern Transitional Council বা STC-র সঙ্গে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্কও জটিল।

২০২৫ সালের শেষ থেকে ২০২৬ সালের শুরুতে দক্ষিণ ইয়েমেনের রাজনৈতিক-সামরিক পুনর্বিন্যাসের ফলে হুথিবিরোধী শিবিরের অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Congressional Research Service-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলিতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতাই হুথিদের শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তারা শুধু একটি আদর্শিক সংগঠন নয়; তারা একটি ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে, প্রশাসন চালায়, কর সংগ্রহ করে, সামরিক বাহিনী পরিচালনা করে এবং স্থানীয় উপজাতীয় ও রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। ফলে তাদের পরাজিত করা কেবল বিমান হামলার বিষয় নয়। ২০১৫ থেকে ২০২২ পর্যন্ত সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে আকাশ থেকে বোমাবর্ষণ একটি শক্তিশালী বিদ্রোহী সংগঠনকে রাজনৈতিকভাবে বিলীন করে দিতে পারে না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, হুথিরা কি সত্যিই সমগ্র ইয়েমেন দখলের দিকে এগোচ্ছে, নাকি তাদের মূল লক্ষ্য পশ্চিম উপকূল, বাব আল-মান্দাব এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের ওপর সামরিক চাপ তৈরি করা। সেপ্টেম্বরের সাম্প্রতিক অগ্রগতি তাদের দ্বিতীয় কৌশলটির গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হুথিরা প্রায় এক লাখ যোদ্ধা সংগঠিত করেছে বলে কয়েকজন পশ্চিমা, আঞ্চলিক ও ইয়েমেনি কর্মকর্তা মনে করছেন; তবে এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন এবং একে নিশ্চিত পরিসংখ্যান হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়টি অবশ্য সামরিক মানচিত্র নয়, ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ।

সেপ্টেম্বরের নতুন সংঘর্ষে এক লাখেরও বেশি মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির তথ্য উদ্ধৃত করে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ এডেনের দিকে পালাচ্ছে, আবার কেউ কেউ নৌকায় করে জিবুতিতে যাওয়ার চেষ্টা করছে। যুদ্ধ যত পশ্চিম উপকূল ও বন্দর অঞ্চলের দিকে এগোচ্ছে, ততই মানবিক সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হচ্ছে।

ইয়েমেনের ট্র্যাজেডি তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। হুথি বিদ্রোহের জন্ম হয়েছে স্থানীয় ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক বঞ্চনা ও রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার মধ্যে; সৌদি সামরিক হস্তক্ষেপ তাকে আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ দিয়েছে; ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন তাকে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির খেলায় গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে; আর গাজা যুদ্ধ তাকে আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এখন বাব আল-মান্দাবের কাছে তাদের সামরিক অগ্রগতি সেই স্থানীয় বিদ্রোহকে এমন এক ভূ-রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে, যার একটি ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথও আন্তর্জাতিক বাজার, জ্বালানি পরিবহণ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

কিন্তু এই সমীকরণের কেন্দ্রে একটি বিষয় যেন হারিয়ে না যায় ইয়েমেন কোনো মানচিত্রের কৌশলগত ঘুঁটি নয়। ২০১৫ সালের পর থেকে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, রোগ, বাস্তুচ্যুতি ও অর্থনৈতিক ধ্বংসের বোঝা বহন করেছে কয়েক কোটি মানুষ। আজ হুথি, সৌদি আরব, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা অন্য কোনো আঞ্চলিক শক্তির কৌশলগত হিসাবের বাইরে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সামরিকভাবে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ ভাঙা সম্ভব হলেও, তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তির সমাধান না হলে নতুন কোনো হুথি-পরবর্তী বিদ্রোহ আবার জন্ম নিতে পারে। একইভাবে হুথিরা যদি আরও ভূখণ্ড দখল করে, তবুও ইয়েমেনের বহুস্তরীয় রাজনৈতিক বিভাজন সামরিক বিজয়কে স্থায়ী রাষ্ট্রীয় বৈধতায় রূপান্তর করবে এমন নিশ্চয়তা নেই।

আজকের ইয়েমেন তাই শুধু হুথিদের গল্প নয়। এটি একটি রাষ্ট্র কীভাবে দুর্বল হয়, স্থানীয় বিদ্রোহ কীভাবে আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতায় ঢুকে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত একটি দেশের ভূগোল কীভাবে বিশ্ব রাজনীতির অংশ হয়ে যায় তার একটি জীবন্ত উদাহরণ। বাব আল-মান্দাবের সরু জলপথে যে উত্তেজনা এখন জমা হচ্ছে, তার অর্থ শুধু ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সৌদি-ইরান সম্পর্ক, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি, আফ্রিকার পূর্ব উপকূল, সুয়েজ খাল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা। আর সেই কারণেই ইয়েমেনের নতুন যুদ্ধকে কেবল ‘হুথিদের বিদ্রোহ’ হিসেবে দেখা এখন আর যথেষ্ট নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের এক বৃহত্তর সংঘাতের এমন একটি ফ্রন্ট, যেখানে স্থানীয় ইতিহাস এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি একই যুদ্ধক্ষেত্রে এসে মিলেছে।


রিপোর্টার্স২৪/ঝুম

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪