সিনিয়র রিপোর্টার : ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় ১৯ জন নিহত এবং অন্তত ১৬৪ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিমানচালকও রয়েছেন। দুর্ঘটনাটি দুপুর ১টা ৬ মিনিটে ঘটে, যখন এফ-৭ বিজেআই মডেলের একটি যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই যান্ত্রিক ত্রুটিতে বিধ্বস্ত হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যে উঠে এসেছে বিভীষিকাময় সেই মুহূর্তের হৃদয়বিদারক চিত্র। কলেজের শিক্ষক নুরুজ্জামান মৃধা বলেন, ‘আমরা রিকশা-ভ্যানে করে পোড়া শরীরের মানুষদের হাসপাতালে পাঠিয়েছি। কিছু লোকের শরীরে তখনো সামান্য কাপড় ঝুলছিল। আমি নিজ চোখে দেখেছি, দগ্ধ শরীর নিয়ে মানুষ নিজেই হেঁটে অ্যাম্বুলেন্সে উঠছে।’
আরেক শিক্ষক বলেন, ‘ছুটির ঘণ্টা বাজার আগ মুহূর্তে ছোট ছোট বাচ্চারা গেটের সামনে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ দেখি আগুন আর ধোঁয়া। চারদিক আগুনে ঘেরা। প্রথমে আগুন দেখি, তারপর ধোঁয়া। আমার দুই হাত পুড়ে গেছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।’
তিনি জানান, ‘আমি ওয়াশরুমে গিয়ে কাপড় ভিজিয়ে নাক মুখ ঢেকে নিই এবং আশেপাশের শিশুদেরও একই করতে বলি। অনেকের শরীরে আগেই আগুন ধরে গিয়েছিল। তাদের বলেছি নিচু হয়ে মুখ ঢেকে রাখো, নাহলে ধোঁয়া শ্বাসনালিতে ঢুকে প্রাণঘাতী হতে পারে।’
এই শিক্ষক আরও বলেন, ‘আমার তিন ছাত্রকে নিয়ে আমি বের হই। আমার ওড়না দিয়ে একজনকে পেঁচিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাই। নিজেও ব্যথায় কাতর ছিলাম, কিন্তু মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করেছি।’
নাইমুল হাসান আদিত, কলেজের মানবিক বিভাগের প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রথমে বিমানটি বিল্ডিং-৭-এ আঘাত হানে, পরে ১০০-১৫০ মিটার দূরে প্রাইমারি সেকশনের ভবনে বিধ্বস্ত হয়।’
একজন আর্তনাদরত মা বলেন, ‘আমার ছেলে ক্লাস সিক্সে পড়ে, এখনও ক্যাম্পাসে ভেতরে আছে। জানি না ও কেমন আছে!’
দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সদস্যরা। ভিড়ের কারণে উদ্ধারকাজে বিঘ্ন ঘটলেও দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়, যার মধ্যে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উল্লেখযোগ্য।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, বিমানটি যান্ত্রিক ত্রুটির কবলে পড়ে বিধ্বস্ত হয়। একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং বিস্তারিত পরে জানানো হবে। বিমান বাহিনী জানিয়েছে, পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তাওকির ইসলাম দুর্ঘটনার আগে জনবহুল এলাকা এড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়নি।
এ দুর্ঘটনায় সারাদেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মঙ্গলবার একদিনের জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করেছে সরকার। সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে এবং মসজিদ, মন্দির, গির্জাসহ সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজন হবে।
এ দুর্ঘটনা শুধু একটি অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা নয়, বরং জাতির জন্য একটি গভীর বেদনাদায়ক মুহূর্ত—যা দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
রিপোর্টার্স২৪/এমবি