| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

যমজ বোনের পিতা আলাদা, কীভাবে সম্ভব?

reporter
  • আপডেট টাইম: মে ০২, ২০২৬ ইং | ২০:৩৯:২৪:অপরাহ্ন  |  ৮৫৯ বার পঠিত
যমজ বোনের পিতা আলাদা, কীভাবে সম্ভব?

রিপোর্টার্স ডেস্ক: যুক্তরাজ্যের বাসিন্দা মিশেল ও লাভিনিয়া অসবোর্ন যমজ বোন। ৪৯ বছর বয়সী এই দুই বোনের মধ্যে বরাবরই ছিল গভীর এক আত্মিক টান। কিন্তু ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে একটি ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল আসার পর তাঁদের জীবনে এক অভাবনীয় সত্য উন্মোচিত হয়। লাভিনিয়া যখন ইমেইলের মাধ্যমে পরীক্ষার ফলাফলটি দেখেন, তখন তিনি তীব্র আতঙ্ক অনুভব করছিলেন।

ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলে জানা যায় এক বিস্ময়কর তথ্য! তাঁরা যমজ হলেও তাঁদের জৈবিক বাবা ভিন্ন। অর্থাৎ, তাঁরা আপন বোন হলেও আসলে হাফ-সিস্টার বা সৎবোন।

এই ঘটনা একটি বিরল জৈবিক প্রক্রিয়ার ফসল, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘হেটেরোপ্যাটারনাল সুপারফেকান্ডেশন’। এই প্রক্রিয়া ঘটার জন্য একজন নারীকে একই ঋতুচক্রে একাধিক ডিম্বাণু উৎপাদন করতে হয় এবং সেই ডিম্বাণুগুলো ভিন্ন ভিন্ন পুরুষের শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হতে হয়। এরপর সেই ভ্রূণগুলোর গর্ভাবস্থায় টিকে থাকা জরুরি। বিশ্বজুড়ে এ ধরনের মাত্র ২০টি ঘটনা শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

বিবিসি রেডিও ৪-এর ধারাবাহিক অনুষ্ঠান ‘দ্য গিফট’-এর অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে, যুক্তরাজ্যে এ পর্যন্ত নথিবদ্ধ হওয়া এটিই একমাত্র ঘটনা, যেখানে যমজ বোনের বাবা ভিন্ন।

লাভিনিয়ার জন্য এই সত্য ছিল অত্যন্ত কঠিন। শৈশবে তাঁদের জীবন খুব একটা সুখের ছিল না। বারবার বাসা বদল ও দীর্ঘ সময় অনাথ আশ্রমে থাকতে হয়েছে তাঁদের। দুই বোনের কাছে একজন-আরেকজনই ছিল একমাত্র নির্ভরতার জায়গা। লাভিনিয়া বলেন, ‘সে ছিল আমার একমাত্র আপন, একমাত্র মানুষ; যাকে আমি নিশ্চিতভাবে আমার নিজের বলে জানতাম। কিন্তু হঠাৎ সব বদলে গেল।’

তবে যখন লাভিনিয়া ফোন করে মিশেলকে এই খবর জানান, তখন মিশেলের অনুভূতি ছিল ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘আমি মোটেও অবাক হইনি। তবে এটি যে ঘটতে পারে, তা এখনো আমার কাছে বিস্ময়কর।

১৯৭৬ সালে নটিংহামে মিশেল ও লাভিনিয়ার মা যখন তাঁদের জন্ম দেন, তখন তিনি ছিলেন মাত্র ১৯ বছর বয়সী একজন তরুণী। মিশেল জানান, তাঁদের মা তাঁর সৎবাবার দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন এবং শৈশব থেকে অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছেন। যমজ বোন যখনই মায়ের কাছে তাঁদের বাবার নাম জানতে চাইতেন, মা সব সময় ‘জেমস’ নামের এক ব্যক্তির কথা বলতেন। মিশেল বলেন, ‘তিনি (বাবা) আমাদের জীবনে কখনোই ছিলেন না।

তাঁদের শৈশবের বড় একটা সময় মা অনুপস্থিত ছিলেন। তাঁদের বয়স যখন পাঁচ, তখন মা লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান এবং দুই শিশুকে নটিংহামে এক বান্ধবীর মায়ের কাছে রেখে চলে যান। লাভিনিয়া জানান, ওই মহিলা ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও আবেগহীন। লাভিনিয়ার ভাষায়, ‘আমার একমাত্র অবলম্বন ছিল মিশেল। পৃথিবীর সবকিছুর বিপরীতে আমরা ছিলাম একে অপরের সঙ্গী।

১০ বছর বয়সে তাঁরা লন্ডনে মায়ের কাছে ফিরে যান। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে তাঁদের আবার মায়ের পরিচিত আগের এক অনাথ আশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কেন মা তাঁদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে চাইতেন, তা তাঁরা বুঝতে পারেননি। লাভিনিয়া বলেন, শারীরিক বা আবেগীয় সব দিক থেকে মা আমাদের থেকে সব সময় দূরে ছিলেন।

শৈশবের বেশির ভাগ সময় মা কাছে না থাকলেও তাঁদের বয়স যখন ১৫-১৬ বছর, তখন জেমস (বাবা) তাঁদের জীবনে ফিরে আসেন। লাভিনিয়া তাঁকে খুঁজে বের করেছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে নিজের চেহারার মিল খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মিশেল নিশ্চিত ছিলেন, জেমস তাঁর বাবা নন। তাঁর মনে সব সময় সন্দেহ ছিল।

২০২১ সালের শেষের দিকে মা আর্লি-অনসেট ডিমেনশিয়ায় (স্মৃতিভ্রম) আক্রান্ত হওয়ায় কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না। জেমসের পুরোনো একটি ছবি দেখে মিশেলের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। মিশেল বলেন, ‘আমি ভাবলাম, তাঁর চেহারার সঙ্গে তো আমার কোনো মিলই নেই। তাই আমি নিজেই একটি ডিএনএ কিট কিনে পরীক্ষা করি।’

ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল আসে ২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। ওই দিনই মিশেল ও লাভিনিয়ার মা মারা যান। ফলাফলে দেখা যায়, জেমস মিশেলের জৈবিক বাবা নন। কয়েক সপ্তাহ অনুসন্ধানের পর মিশেল জানতে পারেন, তাঁর বাবার নাম অ্যালেক্স। তিনি তাঁদের মায়ের এক বান্ধবীর ভাই। মিশেল অ্যালেক্সের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং জানতে পারেন, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে মাদক ও অ্যালকোহলে আসক্ত এবং রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন।

পরবর্তী সময়ে অলিভাইন নামের এক নারীর সঙ্গে দেখা করেন মিশেল ও লাভিনিয়া। অলিভাইন ছিলেন তাঁদের কাজিন। মিশেল তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারেন, অলিভাইনের সঙ্গে তাঁর মিল আছে। কিন্তু লাভিনিয়া কোনো মিল খুঁজে পাননি। অলিভাইনের পারিবারিক ছবিতেও কোনো মিল খুঁজে পান না লাভিনিয়া। এরপর লাভিনিয়াও ডিএনএ পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।

ফলাফল হাতে পাওয়ার পর লাভিনিয়া যখন জানতে পারেন, তাঁর যমজ বোন আসলে তাঁর হাফ-সিস্টার, তখন তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘মিশেলের কারণে আমাকে এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বলে আমি তাঁর ওপর রাগ করেছিলাম। কারণ, আমি এই বাস্তবতা মেনে নিতে পারছিলাম না।’

এরপর আরও বড় সত্য বেরিয়ে আসে। পরীক্ষায় দেখা যায়, জেমস লাভিনিয়ারও বাবা নন। লাভিনিয়া তাঁর আসল বাবার নাম জানতে আগ্রহী ছিলেন না, কিন্তু মিশেল নাছোড়বান্দা ছিলেন। মিশেল অনুসন্ধান চালিয়ে আর্থার নামের এক ব্যক্তিকে খুঁজে পান। তিনিই ছিলেন লাভিনিয়ার জৈবিক বাবা। তাঁরা দুজন পশ্চিম লন্ডনে আর্থারের বাড়িতে দেখা করতে যান। লাভিনিয়া বলেন, ‘তিনি কিছুটা নার্ভাস ছিলেন, কিন্তু তাঁকে আমার মতোই প্রাণবন্ত মনে হচ্ছিল।’

লাভিনিয়া এবং আর্থার এরপর থেকে একে অপরের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। মাসে কয়েকবার তাঁদের দেখা হয়, কখনো মিশেলকেও সঙ্গে নিয়ে যেতেন লাভিনিয়া। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় আমি আমার আপন জায়গা খুঁজে পেয়েছি, আর সেই জায়গা আমার বাবার কাছে।’ আর্থার মিশেলকেও বলেছেন, সে চাইলে তাঁকে ‘বাবা’ বলে ডাকতে পারে।

একবার দুই বোন আর্থারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাঁরা কীভাবে পৃথিবীতে এল, সে সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন কি না। মিশেল জানান, আর্থার বলেছিলেন, ‘তোমাদের মা একদিন আমার দরজায় নক করেছিল। তখন সে খুব ভেঙে পড়েছিল এবং কাঁদছিল। পরে আমি তাঁকে আশ্রয় দিই।’

মিশেল ও লাভিনিয়ার মা আর বেঁচে নেই যে তিনি আসল ঘটনা বলবেন। তবে আর্থারের ভাষ্যমতে, সংকটে পড়ে তাঁর মা সাহায্য চেয়েছিলেন। এরপর সে কিছুদিন তাঁর সঙ্গে ছিল।

মিশেল তাঁর জৈবিক বাবা অ্যালেক্সের সঙ্গেও দেখা করেছেন। মিশেল বলেন, ‘তিনি তখন মাদকাসক্ত ছিলেন। তবে তাঁদের চেহারার মিল ছিল। মিশেল বলেন, ‘সে আমার বাবা, আমি তাঁর মেয়ে, কিন্তু আমার মনে হয়নি যে ভবিষ্যতে তাঁর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। আমার শুধু জানার দরকার ছিল।

বাস্তবতা হলো, দুই বোন কখনোই জানতে পারবেন না, তাঁদের মা জানতেন কি না যে তাঁদের বাবা আলাদা। কিন্তু লাভিনিয়া বলেন, এটা হয়তো তাঁকে ভেতরে-ভেতরে কষ্ট দিয়েছে। তিনি কিছু না কিছু জানতেন ও বুঝতেন।’ মিশেল বলেন, ‘আমার মনে হয় মা জানতেন, কিন্তু তা অস্বীকার করতেন।

ডিএনএ পরীক্ষায় জানা গেছে, লাভিনিয়া ও মিশেল সৎবোন। তবে তাঁরা সব সময় একে অপরের সঙ্গে থাকবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। লাভিনিয়া বলেন, আমরা এক অলৌকিক সৃষ্টি। আমাদের মধ্যে এমন ঘনিষ্ঠতা সব সময় থাকবে। এটা কখনো ভাঙবে না।’ মিশেল বলেন, ‘সে আমার যমজ বোন। এর চেয়ে বড় কোনো সত্য নেই।

রিপোর্টার্স২৪/মিতু  

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪