আপডেট টাইম:
জুন ০৯, ২০২৬ ইং | ১১:৫৪:১৩:পূর্বাহ্ন | ১২৭২৭৮ বার পঠিত
খাদেমুল বাবুল, জামালপুর: জামালপুরে আবার চালু হয়েছে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামায়াআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আব্দুর রহমানের মাদ্রাসা। শায়খ আব্দুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর মাদ্রাসাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ ২০ বছর পর আবারও চালু করা হয়েছে জঙ্গি সংগঠনের এই মাদ্রাসাটি।
২০০৭ সালে এই জঙ্গি নেতার ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর থেকেই বন্ধ ছিল মাদ্রাসাটি। বর্তমানে তার ভাই ওবায়দুর রহমান মাদ্রাসাটি আবারও চালু করেছেন। ওবায়দুর রহমানও জেএমবি-সংশ্লিষ্ট মামলায় এক যুগেরও বেশি সময় কারাভোগ করেছেন।
জামালপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার তিতপল্লা ইউনিয়নের চরশী খলিফাপাড়া গ্রামে ১৯৭৫ সালে চরশী হাবিরুন্নেসা হাফিজিয়া মাদ্রাসা নামে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শায়খ আব্দুর রহমানের বাবা আব্দুল্লাহ ইবনে ফজল ওরফে ফজল মুন্সী। আব্দুর রহমান ওই মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন।
ওই সময় এই মাদ্রাসায় জঙ্গি প্রশিক্ষণ চলত বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। শায়খ আব্দুর রহমান ছাড়াও তার ছোট ভাই আতাউর রহমান সানিও ছিলেন জেএমবির শীর্ষ নেতা।
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট একমাত্র মুন্সীগঞ্জ জেলা ছাড়া দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলার পর জেএমবির নাম সামনে আসে। তবে এই সংগঠন গঠিত হয় তারও ১৭ বছর পূর্বে। জানা যায়, রাজশাহীর বাগমারা অঞ্চলে উগ্র বামপন্থীদের দমনের নামে অনেক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বাধীন জেএমবি।
তখন শায়খ আব্দুর রহমান ও তার ডেপুটি কমান্ডার সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ভাইকে নিয়ে সারা দেশে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার শুরুতে বাংলা ভাইদের অস্তিত্ব অস্বীকার করলেও পরে তদন্ত করে জেএমবির সত্যতা পায়। পরে বিভিন্ন অভিযানে জেএমবি প্রধান শায়খ আব্দুর রহমান, তার ছোট ভাই আতাউর রহমান সানি, সিদ্দিকুর রহমান (বাংলা ভাই), খালেদ সাইফুল্লাহ ও সালাহউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন।
২০০৭ সালের মার্চ মাসে নিষিদ্ধ সংগঠন জামায়াআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। সে সময় বন্ধ হয়ে যায় মাদ্রাসাটি।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রায় এক মাস পর, ২০২৫ সালের শুরুতে জেএমবির মামলায় কারাভোগকারী শায়খ আব্দুর রহমানের ভাই ওবায়দুর রহমান স্বল্প পরিসরে মাদ্রাসাটির কার্যক্রম শুরু করেন।
বর্তমানে সেটি বৃহৎ পরিসরে চালুর চেষ্টা চলছে। ওবায়দুর রহমান ওই মাদ্রাসার পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রধান শিক্ষক হিসেবে আছেন মো. জাকারিয়া হোসেন। আর ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে আছেন টাঙ্গাইল জেলার একটি মাদ্রাসার ভাইস-প্রিন্সিপাল মো. আমিনুল ইসলাম।
প্রায় এক একর জমির ওপর নির্মিত ওই মাদ্রাসার প্রবেশপথে দেখা যায় একটি পুরোনো মসজিদ। এরপর তিনটি আধাপাকা ভবন, যার একটিতে অফিস কক্ষ, বাকি দুটিতে চলে পাঠদান। সরেজমিনে শনিবার (৬ জুন) সেখানে কয়েকজন শিক্ষার্থীর দেখা মেলে।
মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মো. রাকিব জানান, সেখানে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চলে।
শতাধিক শিক্ষার্থীকে মাসিক ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা বেতনে বাংলা ও নূরানি পদ্ধতিতে পাঠদান করানো হয় বলে জানান সহকারী পরিচালক মো. শাহজামাল।
মাদ্রাসাটিতে ১১ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। এদের মধ্যে প্রধান শিক্ষকসহ পুরুষ শিক্ষক চারজন, তিনজন সহকারী শিক্ষক, যাদের সবাই নারী এবং বাকিরা কর্মচারী। প্রত্যেকেই এই এলাকা বা আশপাশের বাসিন্দা বলে জানা গেছে।
প্রধান শিক্ষক মো. জাকারিয়া হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘২০০০ সালের দিকে বেশ সরগরম ছিল মাদ্রাসাটি। তবে ওই সময় এই মাদ্রাসার শিক্ষক বা শিক্ষার্থী কেউই এই এলাকার বাসিন্দা ছিলেন না। তারা বাইরের লোক ছিলেন। তখন মাদ্রাসায় কেউ প্রবেশ করতে পারত না। ফলে দেখা বা বোঝা যেত না মাদ্রাসার ভেতরে কী হচ্ছে। সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন শায়খ আব্দুর রহমান ও তার ভাই সানি।’
দুই বছর আগেও না জানিয়ে মাদ্রাসা খোলা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ এসে বন্ধ করে দেয়। প্রধান শিক্ষক মো. জাকারিয়া হোসেন আরও বলেন, বর্তমানের চিত্র ও প্রেক্ষাপট পুরোটাই ভিন্ন। ‘এখন মাদ্রাসার গেট বা দরজা সবসময় খোলা থাকে।’
মাদ্রাসার পরিচালক এবং শায়খ আব্দুর রহমান ও আতাউর রহমান সানির ভাই ওবায়দুর রহমানের মোবাইল ফোনে কল করা হলে তার স্ত্রী সাবিনা খাতুন ফোন রিসিভ করেন।
তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী দীর্ঘ ১৩ বছর কারাগারে ছিলেন। আমাদের সঙ্গে এক ব্যক্তির জমি নিয়ে কিছু বিরোধ চলছে। তাই তিনি এই মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে অতীত ইতিহাস টেনে অনেক কিছু রটানোর চেষ্টা করছেন।’
এই কথোপকথনের মধ্যে ফোন ধরেন ওবায়দুর রহমানও। কার অনুমতিতে মাদ্রাসাটি চালু হয়েছে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘মাদ্রাসাটি কেউ বা কোনো কর্তৃপক্ষ বন্ধ করেনি। তাই চালুর সময়ও কারও অনুমতি নেওয়া হয়নি।’ এলাকার লোকজনের দানের পাশাপাশি কিছু সরকারি সহায়তা পাওয়ার কথাও বলেন তিনি।
উল্লেখ্য, জেএমবি নেতা শায়খ আব্দুর রহমান জামালপুরের আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা মির্জা আজমের সহোদর ছোট বোনের জামাই।
এ ব্যাপারে জামালপুরের পুলিশ সুপার মোছা. ফারহানা ইয়াসমিনের সঙ্গে তার অফিসিয়াল মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের দেখার দায়িত্ব নয়। তবে আমরা খোঁজ নেব, উল্লেখিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো অনৈতিক বা রাষ্ট্রবিরোধী কাজ হচ্ছে কি না। যদি কোনো অনৈতিক বা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে পুলিশ অবশ্যই আইনগত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
এ ব্যাপারে জামালপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইউসুফ আলীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তার অফিসিয়াল মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।