ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: সৌদি আরবের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি একটি বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলার অনুমতি পেতে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই 'শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি'র ফলে সৌদি আরবের পারমাণবিক শক্তি খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর বড় ধরনের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
চুক্তির বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এর আওতায় ভবিষ্যতে সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হতে পারে। ইউরেনিয়াম মূলত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এটি পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রধান উপকরণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন অনুমতি দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রথম কোনো ঘটনা হবে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের মতো একটি অস্থিতিশীল অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, এই সহযোগিতার পাশাপাশি একটি 'দ্বিপাক্ষিক সুরক্ষা চুক্তি'ও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, 'এই দুই চুক্তি কয়েক দশকব্যাপী শত শত কোটি ডলারের অংশীদারত্বের আইনি ভিত্তি স্থাপন করল। এটি পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণসহ বেশ কিছু অর্থনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে।'
সৌদি সরকারও এক বিবৃতিতে এই চুক্তির খবর নিশ্চিত করেছে। তারা জানিয়েছে, এটি জ্বালানি খাতে দুই দেশের বিদ্যমান সহযোগিতারই একটি অংশ। গত বছরের নভেম্বরে সৌদি নেতার ওয়াশিংটন সফরের ধারাবাহিকতায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেই এই চুক্তির ঘোষণা এল। সৌদি আরবে বেশ কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, যেগুলো প্রায়ই ইরানি হামলার শিকার হচ্ছে। এ ছাড়া ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে 'নৌ-অবরোধ' ঘোষণার দুই দিনের মাথায় এই চুক্তি হলো।
পরমাণু চুক্তির সুনির্দিষ্ট বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। তবে গণমাধ্যমের আগের প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি যৌথ সমীক্ষা শেষে সৌদি আরবকে তাদের নিজস্ব মাটিতেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হতে পারে। এর ফলে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভর না করে, তারা আমেরিকার তৈরি একটি সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা থেকেই নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন করতে পারবে।
এতে মার্কিন কোম্পানিগুলো বিপুল লাভবান হবে। মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট এক বিবৃতিতে বলেন, 'নিশ্চিত থাকুন, এই চুক্তি পারমাণবিক নিরাপত্তার সর্বোচ্চ মান বজায় রাখবে।'
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান মিত্র ইসরায়েলের পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কর্মকর্তারা এই চুক্তিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এটি শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
মার্কিন থিঙ্কট্যাংক 'ডিফেন্স প্রায়োরিটিস'-এর পরিচালক রোজমেরি কেলানিক বলেন, 'সৌদি আরবকে নিজ মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ দেওয়া হলে তা হবে স্তম্ভিত করার মতো বিষয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশকে এমন কাজে সাহায্য করেনি।'
চুক্তিটি এখন পর্যালোচনার জন্য মার্কিন কংগ্রেসে পাঠানো হবে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের কিছু সদস্য এর বিরোধিতা করতে পারেন। তবে বর্তমান কংগ্রেসে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সমালোচকদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো চুক্তিতে পৌঁছাবে না যা অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ায়।
তবে ডেমোক্র্যাট সিনেটর এডওয়ার্ড মার্কি এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্প ও রুবিওকে 'ভণ্ড ও বেপরোয়া' অভিহিত করে তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইরানের পারমাণবিক বোমা ঠেকানোর অজুহাতে যুদ্ধ করছে, অন্যদিকে সৌদি আরবের মতো একটি কর্তৃত্ববাদী দেশকে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে।
রিপোর্টার্স২৪/এম এইচ