ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। উন্নত এআই মডেল, চিপ, কম্পিউটিং সক্ষমতা থেকে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই চলছে প্রতিযোগিতা। কিন্তু এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেই এআই থেকে তৈরি হতে পারে এমন জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের নতুন পথ খুঁজছে দুই দেশ।
জাতীয় নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে—এমন এআই-সংক্রান্ত গুরুতর কোনো ঘটনা ঘটলে এক দেশ যেন অন্য দেশকে দ্রুত জানাতে পারে, সে জন্য একটি ‘নোটিফিকেশন মেকানিজম’ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট রোববার সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। নিউইয়র্কে চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী হে লিফেংয়ের সঙ্গে প্রায় আট ঘণ্টার বৈঠকের পর তিনি বলেন, বিশ্বের শীর্ষ দুই এআই শক্তির মধ্যে এ ধরনের বিষয়ে আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
বেসেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো এআই-সংক্রান্ত ঘটনা জাতীয় নিরাপত্তার পর্যায়ে পৌঁছালে সেটি দুই দেশের মধ্যে জানানোর জন্য একটি প্রক্রিয়া গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আরও আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে। তবে এখনো এমন কোনো পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হয়নি, যাতে নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে—কোন ধরনের ঘটনায়, কীভাবে এবং কত দ্রুত এক দেশ অন্য দেশকে জানাবে।
অর্থাৎ আপাতত এটি একটি সম্ভাব্য যোগাযোগ কাঠামো, যা ভবিষ্যতের আলোচনার ভিত্তি হিসেবে সামনে এসেছে।
এআই এখন আর শুধু প্রযুক্তি বা ব্যবসার বিষয় নয়। সাইবার নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সামরিক সক্ষমতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও উন্নত এআই ব্যবস্থার সম্পর্ক দ্রুত বাড়ছে।
এআইয়ের অপব্যবহারের মাধ্যমে সাইবার হামলা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় বিঘ্ন, বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোসহ বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মধ্যে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান ভুল বোঝাবুঝি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
সাম্প্রতিক আলোচনায় তাই জাতীয় নিরাপত্তা পর্যায়ে পৌঁছানো এআই ঘটনার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সতর্কবার্তা বা নোটিফিকেশনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
নিউইয়র্কের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-চীন ‘এআই ডায়ালগ’ চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সম্ভাব্য জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এমন এআই-সংক্রান্ত ঘটনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের একটি কাঠামো তৈরি করা এর অন্যতম লক্ষ্য।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, বৈঠকে দুই পক্ষ অর্থনীতি ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়েও খোলামেলা, গভীর ও গঠনমূলক আলোচনা করেছে। এর মধ্যে এআই-সংক্রান্ত বিষয়ও ছিল।
তবে প্রযুক্তি খাতে দুই দেশের অবিশ্বাস ও প্রতিযোগিতা কতটা সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দুটি অর্থনীতি বর্তমানে এআই প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় রয়েছে। উন্নত এআই মডেল তৈরি, সেমিকন্ডাক্টর, কম্পিউটিং সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো—সব ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র উন্নত প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানির ক্ষেত্রে চীনের ওপর বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। অন্যদিকে চীন নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এই প্রতিযোগিতার মধ্যেই এআইয়ের দ্রুত বিকাশ নিয়ে বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা উদ্বেগও বাড়ছে। গবেষক ও প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন পক্ষ উন্নত এআই ব্যবস্থার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রিত উন্নয়নের আহ্বান জানিয়েছে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বানের প্রতি সমর্থন দেখাননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এআইয়ে যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে গেলে চীন সেই ব্যবধান কাজে লাগাতে পারে।
নিউইয়র্কের বৈঠনে এআইয়ের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বাণিজ্য বিরোধ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
দুই পক্ষ ‘বোর্ড অব ট্রেড’ নামে একটি প্রক্রিয়া কার্যকর করার বিষয়ে কাজ করছে। এর মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে কম সংবেদনশীল পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে শুল্ক কমানোর সুযোগ খুঁজে দেখা হবে।
সম্ভাব্য তালিকায় ভোক্তাপণ্য, কৃষিপণ্য, জ্বালানি ও কিছু চিকিৎসা সরঞ্জাম রাখার বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল মাটির উপাদানের সরবরাহসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে।
চলমান শুল্কযুদ্ধের সাময়িক বিরতি ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা। ফলে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের আসন্ন বৈঠকের আগে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থিতিশীল করার বিষয়টিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
নিউইয়র্কের আলোচনা মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আসন্ন শীর্ষ বৈঠকের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বেসেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, নিউইয়র্কের আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নেওয়া এবং মার্কিন জনগণের জন্য ফলাফল নিশ্চিত করার ভিত্তি তৈরিতে সহায়তা করেছে।
অন্যদিকে চীনা পক্ষও বৈঠকটিকে গঠনমূলক হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তবে এআই নিরাপত্তায় প্রস্তাবিত যোগাযোগ ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা এগোবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা এবং প্রযুক্তিগত ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থের সংঘাত কতটা সামাল দেওয়া যায় তার ওপর।
এর আগে মে মাসে বেইজিংয়ে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকেও এআই সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। একই সঙ্গে বাণিজ্য নিয়েও সমঝোতার চেষ্টা হয়।
এবার ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে এআই নিরাপত্তায় পারস্পরিক সতর্কবার্তার সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে আলোচনা দেখাচ্ছে—প্রযুক্তির দৌড়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যতই তীব্র হোক, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে অন্তত সীমিত যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা ওয়াশিংটন ও বেইজিং উভয় পক্ষই বিবেচনা করছে।
রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ