| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

রপ্তানির ৮ হাজার কোটি উধাও, অনুসন্ধানে ৪ সংস্থা

reporter
  • আপডেট টাইম: Jul ২৮, ২০২৬ ইং | ২৩:১১:৪১:অপরাহ্ন  |  ৬৩৯ বার পঠিত
রপ্তানির ৮ হাজার কোটি উধাও, অনুসন্ধানে ৪ সংস্থা

স্টাফ রিপোর্টার: রপ্তানি আয়ের সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা দেশে এসেছে, কিন্তু জমা হয়নি ফরেন কারেন্সি (এফসি) অ্যাকাউন্টে। অভিযোগ— সেই অর্থের হিসাব উধাও করে একই লেনদেনের বিপরীতে তৈরি করা হয়েছে ফোর্সড লোন (গ্রাহকের অসম্মতিতে ঋণ)। কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের লেনদেনকে কেন্দ্র করে ঘটেছে এমন অনিয়মের ঘটনা। এর রহস্য উদঘাটনে যৌথ অনুসন্ধানে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) ও বাংলাদেশ সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

এদিকে আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ঘটনা রপ্তানি আয় ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং হিসাব, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা— এ চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভকে একসঙ্গে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

জানা গেছে, প্রায় দুই দশকের লেনদেন ঘিরে কেয়া গ্রুপের পণ্য রপ্তানির বিপরীতে ৮ হাজার কোটি টাকা (৬৬ কোটি ডলার) দেশে ঢুকলেও তা এফসি অ্যাকাউন্টে জমা করেনি সংশ্লিষ্ট চারটি ব্যাংক। এর মধ্যে সাউথইস্ট ব্যাংক ৩৯.৪৬ কোটি, পূবালী ব্যাংক ২০.১৯ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক ৫.৮৫ কোটি এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ৬৫ লাখ ডলার। যদিও এ অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের ড্যাশবোর্ডে রয়েছে। শুধু তাই নয়, চার ব্যাংকই প্রতিষ্ঠানটিকে দিয়েছে পিআরসি (প্রসিড রিয়ালাইজেশন সার্টিফিকেট)। উল্লেখ্য, পিআরসি হচ্ছে রপ্তানির বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা সফলভাবে দেশে এসেছে এবং প্রক্রিয়া করা হয়েছে— এ-সংক্রান্ত ব্যাংকের দেওয়া চিঠি।

আরও জানা গেছে, সেই রপ্তানি লেনদেনের বিপরীতে কেয়া কসমেটিকসের নামে যে ফোর্সড লোন দেওয়া হয়েছিল, সেটি পর্যায়ক্রমে টার্ম লোনে রূপান্তর করা হয়েছে। টার্ম লোন হচ্ছে গ্রাহককে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দেওয়া, যা কিস্তিতে সুদসহ মূলধন পরিশোধ করতে হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ব্যাংকগুলোর অনিয়মের কারণে তাদের প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ঋণখেলাপি দেখানো হয়েছে। এতে বন্ধ হয়ে গেছে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম।

এ প্রতিবেদক গত আগস্টে চারটি ব্যাংকে যোগাযোগ করলে সাউথইস্ট ব্যাংক অভিযোগ অস্বীকার করে বিএসইসির অডিট প্রতিবেদনের অপেক্ষার কথা জানিয়েছে। পূবালী ব্যাংক কোনো মন্তব্য করেনি এবং ন্যাশনাল ব্যাংক ‘নো কমেন্টস’ বলেছে। আর স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক অভিযোগকে ‘মিস ইনফরমেশন’ দাবি করে তা নাকচ করেছে।

জানতে চাইলে কেয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক পাঠান একটি গণমাধ্যমকে সাউথইস্ট ব্যাংকের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, ‘আমার এক্সপোর্ট রিয়ালাইজ হয়েছে ১০০০ মিলিয়ন ডলার। ব্যাংক এর মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের ডকুমেন্টস (এফডিবিপি) পারচেজ দেখিয়ে আগেই নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট থেকে কেটে রেখেছে। আমার কথা হলো, ৪০০ মিলিয়ন কাটা হলেও বাকি ৬০০ মিলিয়ন তো আমার এফসি অ্যাকাউন্টে পাব। কিন্তু ব্যাংক অদ্ভুতভাবে অবশিষ্ট ৬০০ মিলিয়ন থেকে পুনরায় ৪০০ মিলিয়ন ডেবিট করেছে। এই বেআইনি ডাবল ডেবিটিংয়ের কারণে আমার আমদানির পেমেন্ট আটকে গেছে। সম্পূর্ণ ডলার রিয়ালাইজ হওয়ার পরও তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার ঘাড়ে ফোর্সড লোন চাপিয়ে ঋণের বোঝা বাড়াচ্ছে। একইভাবে ঘটনা অন্য তিনটি ব্যাংকের ক্ষেত্রেও ঘটেছে।’

তিনি আরও জানাচ্ছেন, সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, এফআরসি ডাবল ডেবিটিংয়ের তদন্তের নির্দেশ দিলেও বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিএসইসির তালিকাভুক্ত ফার্ম অডিটর আজিজ হালিম সেই মোতাবেক কাজ করছে না। ব্যাংকগুলো ভুয়া হিসাব তাদের চািপয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘গাইডলাইন ফর ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রানজেকশন-২০০৯’ সার্কুলার মানা হয়নি। সেটি মানা হলে এ বিপর্যয় হতো না— যোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, এটি না মানার কারণে রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হিসাবে অমিল থাকবে, যা শেষ পর্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়বে রিজার্ভের ওপর।

দুদকের অনুসন্ধান: এ ঘটনায় তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে দুদক। ১. রপ্তানি আয়ের অর্থ যথাযথভাবে দেশে এসেছে কি না; ২. বাংলাদেশ ব্যাংকের ড্যাশবোর্ডে এলসি রিয়ালাইজড (আদায় করা রপ্তানি আয়) দেখানোর পরও কেন একই লেনদেনের বিপরীতে ফোর্স লোন বহাল রয়েছে; ৩. এই পুরো প্রক্রিয়ায় মানি লন্ডারিং, ব্যাংকিং জালিয়াতি অথবা আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে কি না।

এসবের উত্তর খুঁজতেই দুদক গত বছর ৪ ডিসেম্বর প্রথমে কেয়া কসমেটিকসের চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকে। এরপর চলতি বছর ২৪ জুন সাউথইস্ট ব্যাংকের কাছে সংশ্লিষ্ট সব নথি চেয়ে দুদক থেকে চিঠি পাঠানো হয়। পাশাপাশি গত ৫ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ অপারেশন বিভাগকে আনুষ্ঠানিক মতামত দিতে পৃথক আরেকটি চিঠি ইস্যু করে সংস্থাটি। দুই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়— বাংলাদেশ ব্যাংকের ড্যাশবোর্ডে সংশ্লিষ্ট ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির অর্থ রিয়ালাইজড দেখানোর পরও কেন ফোর্সড লোনের বকেয়া এখনো বহাল রয়েছে— এর ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নথিতে নতুন প্রশ্ন: সূত্র জানাচ্ছে, এফআরসি সিদ্ধান্ত ও দুদকের চিঠি পাওয়ার পর সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিক বৈঠক করেছে সাউথইস্ট ব্যাংক ও কেয়া গ্রুপের সঙ্গে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, কেয়া কসমেটিকসের রপ্তানি আয়ের ডলার দেশে আসেনি। এটি সিস্টেমের সরাসরি লঙ্ঘন। এজন্য ব্যাংকগুলো বা কোম্পানি যেই হোক, দোষীদের প্রচলিত ব্যাংকিং আইনে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। আর ২০ বছর পর হলেও দায় শোধ করতেই হবে। তবে রপ্তানি আয় দেশে না আসা নিয়ে এখনো তদন্ত চলমান। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সম্পন্ন করার জন্য সময় চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে অবহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশ থেকে ডলার না আসার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নজরদারি করেছে।

এফআরসির অনুসন্ধান: রপ্তানি প্রক্রিয়া, ফোর্স লোন, ফরেন ডকুমেন্ট বিলস পারচেজ (এফডিবিপি), নিরীক্ষকের বক্তব্য, প্রতিষ্ঠানের পাওনা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি রিয়ালাইজড— এ ছয়টি তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য জানতে অনুসন্ধানে নামে এফআরসিও। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে ২৬ আগস্ট ডাকা হয় কেয়া গ্রুপসহ সংশ্লিষ্ট চার ব্যাংককে। নথিপত্র পর্যালোচনা করে এফআরসি দেখতে পায়, একদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী কিছু রপ্তানি আয় রিয়ালাইজড হিসেবে দেখিয়েছে। অন্যদিকে কোম্পানির আর্থিক বিবরণী, ব্যাংকের হিসাব এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদনে একাধিক প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। এফআরসির বিশ্লেষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে এসেছে, সেটি হলো— একই লেনদেন ঘিরে তিন ধরনের হিসাব রয়েছে। এগুলো হচ্ছে— বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানির মনিটরিং সিস্টেম, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ফোর্স লোন ও ঋণের লেনদেনের রেকর্ড এবং কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন। এ তিনটির মধ্যে যদি অমিল থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে— রপ্তানি আয় কোথায় গেল, এফসি অ্যাকাউন্টে কত জমা হয়েছে, ঋণ সমন্বয় হয়েছে কীভাবে, ফোর্স লোন সৃষ্টির ভিত্তি কী ছিল এবং কোন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নিরীক্ষক জবাব দিয়েছে।

সেগুলো বিশ্লেষণ করে দুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে এফআরসি। এর একটি হলো— অভিযুক্ত চার ব্যাংক থেকে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্ট এবং ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন এক্সচেঞ্জ ইন্সপেকশন। পরে তথ্য পর্যালোচনার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আর দ্বিতীয় সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, কেয়া কসমেটিকসের আর্থিক প্রতিবেদনের বিশেষ নিরীক্ষার জন্য বিএসইসির নিয়োগপ্রাপ্ত পিকেএফ আজিজ হালিম কবির চৌধুরী চার্টার্ড অ্যাকাউন্টসের নিরীক্ষা প্রতিবেদনও বিবেচনায় নেবে বিএসইসি। অর্থাৎ বিএসইসির নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশে ব্যাংকের সিদ্ধান্তের আলোকে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানতে চাইলে এফআরসির চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন একটি গণমাধ্যকে বলেছেন, ‘এ ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান বের করতে আমরা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও কেয়া গ্রুপকে নিয়ে বৈঠক করেছি। সব পক্ষই মতামত তুলে ধরেছে। নথিপত্র বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিএসইসি প্রতিষ্ঠানের কাছে নথি পাঠানো হয়েছে।’

বিএসইসির বিশেষ নিরীক্ষা: এফআরসির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নথি পর্যালোচনা করছে সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের তালিকাভুক্ত অডিট ফার্ম আজিজ হালিম। জানতে চাইলে আজিজ হালিম অডিট ফার্মের পক্ষ থেকে গোলাম ফজলুল কবির একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘কেয়া কসমেটিকস ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মধ্যকার তদন্তের কাজ চলমান এবং এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এরই মধ্যে একাধিক সভা হয়েছে এবং বিষয়টি এখন পর্যালোচনা পর্যায়ে রয়েছে।’

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪