কালাই (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি: ঋণের কিস্তির চাপ সামলাতে না পেরে কিডনি বিক্রির আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দিনমজুর মন্টু মিয়া। অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক অঙ্গ পাচারকারী চক্র তাকে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ভারত হয়ে নেপালে নিয়ে যায়। সেখানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার একটি কিডনি অপসারণ করা হয়। কিন্তু দেশে ফেরার পর প্রতিশ্রুত অর্থ না দিয়ে মাত্র ৫০ হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে আত্মগোপনে চলে যায় চক্রটি। দীর্ঘদিন বিচার না পেয়ে শেষ পর্যন্ত জয়পুরহাট আদালতে মামলা করেছেন তিনি।
যেভাবে প্রলোভনের ফাঁদে পড়েন
মামলার অভিযোগ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সংসারের অভাব মেটাতে স্থানীয় কয়েকটি এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন মন্টু মিয়া। দিনমজুরির আয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে চরম সংকটে পড়েন তিনি। এমন সময় জয়পুরহাটের কালাই এলাকায় সক্রিয় একটি দালাল চক্র তার সঙ্গে যোগাযোগ করে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দালালরা জানায়, ঢাকার এক ধনী নারীর কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে। একটি কিডনি দিলে বিনিময়ে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হবে। সেই টাকায় ঋণ পরিশোধ করে নতুন জীবন শুরু করা যাবে এমন আশ্বাসেই রাজি হন মন্টু মিয়া।
এরপর চক্রটি দ্রুত তার পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ব্যবস্থা করে। গত জানুয়ারির শুরুতে অগ্রিম হিসেবে মাত্র ৫০ হাজার টাকা দিয়ে প্রথমে ভারতে এবং পরে নেপালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার একটি কিডনি অপসারণ করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘অঙ্গও গেল, টাকাও পেলাম না’
আদালত প্রাঙ্গণে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মন্টু মিয়া বলেন,
“ঋণের কিস্তির টাকা শোধ করতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। দালালরা ১০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু কিডনি কেটে নেওয়ার পর মাত্র ৫০ হাজার টাকা দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেয়। বাকি টাকা চাইতে গেলে উল্টো প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এখন আগের মতো কাজ করতে পারি না। আমার শরীরের অঙ্গও গেল, অভাবও মিটল না। আমি এখন জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে আছি।”
দেশে ফিরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের পর কয়েকদিন চিকিৎসা দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পরে প্রতিশ্রুত বাকি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাইলে দালালরা যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিসের চেষ্টা করেও কোনো সমাধান হয়নি। বরং বিষয়টি প্রকাশ করলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
কর্মক্ষমতা হারিয়ে মানবেতর জীবন
একটি কিডনি হারানোর পর মন্টু মিয়া নিয়মিত শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। সামান্য পরিশ্রম করলেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কর্মক্ষমতা হারানোয় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে পরিবারটি।
পরিবারের সদস্যরা বলেন, টাকাও পেলাম না, মানুষটার শরীরটাও শেষ করে দিল। এখন চিকিৎসা করানোর সামর্থ্যও নেই। আমরা শুধু দোষীদের বিচার চাই।
আদালতে মামলা, ছয়জনের নাম উল্লেখ
প্রতারণার শিকার হয়ে গত ১৩ জুন জয়পুরহাটের আমলি আদালত-৫-এ মন্টু মিয়া বাদী হয়ে ছয়জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৩ থেকে ৪ জনকে আসামি করে একটি সিআর মামলা দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে ১৪ জুন কালাই থানায় মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-এর আওতায় মামলাটি এফআইআর (মামলা নং-১৪) হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
মামলার এজাহারে বগুড়া, জয়পুরহাট ও নোয়াখালীর ছয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা পরস্পরের যোগসাজশে ১০ লাখ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে বিদেশে নিয়ে যান এবং প্রতারণার মাধ্যমে তার একটি কিডনি অপসারণ করে প্রতিশ্রুত অর্থ আত্মসাৎ করেন। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য
কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশে মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুতর অপরাধ। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে পুলিশ কাজ করছে।
আইনজীবীর মতামত
জয়পুরহাট জেলা জজ আদালতের আইনজীবী মো. উজ্জ্বল হোসেন বলেন, দরিদ্র মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে বিদেশে নিয়ে অঙ্গ অপসারণের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি সংঘবদ্ধ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
উঠছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
ঘটনার পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। একজন দরিদ্র দিনমজুরকে কীভাবে এত সহজে পাসপোর্ট করিয়ে বিদেশে নেওয়া হলো? ভারত হয়ে নেপালে চিকিৎসার নামে অঙ্গ অপসারণের পুরো প্রক্রিয়ায় কারা জড়িত ছিল? সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল, দালাল ও অর্থ লেনদেনের নেপথ্যের ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে কি? নাকি এর পেছনে আরও বড় আন্তর্জাতিক অঙ্গ পাচারকারী চক্র সক্রিয়?
মন্টু মিয়ার অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে শুধু একজন ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারই নয়, দরিদ্র মানুষকে টার্গেট করে সক্রিয় সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গ পাচারকারী নেটওয়ার্কের চিত্রও সামনে আসতে পারে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম