| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

চীনের জিডিআই-এ যোগদান: বাংলাদেশের সামনে কী অপেক্ষা করছে?

reporter
  • আপডেট টাইম: অগাস্ট ০৫, ২০২৬ ইং | ২৩:৪৫:৫২:অপরাহ্ন  |  ৭৯৪ বার পঠিত
চীনের জিডিআই-এ যোগদান: বাংলাদেশের সামনে কী অপেক্ষা করছে?

অধ্যাপক সুজিত কুমার দত্ত:

গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই)-এ যোগদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন কূটনীতির এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। ২০২৬ সালের জুনের শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (MoU) চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ধারাবাহিক অগ্রগতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। বাংলাদেশ ও জিডিআইভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও যোগাযোগে পাঁচ দশকের ক্রমবর্ধমান সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় এবার দেশটি জিডিআই কাঠামোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পৃক্ত হলো। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার পরিবর্তিত বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্ত বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

একসময় উন্নয়ন অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো সহায়তায় পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাধান্য ছিল। কিন্তু বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই), এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) এবং জিডিআই-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে চীন এখন বৈশ্বিক উন্নয়ন প্রকল্পের অন্যতম বৃহৎ অংশীদারে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে, তেমনি সুশাসন, স্বচ্ছতা, কৌশলগত স্বাধীনতা, তথ্যপ্রাপ্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আনছে।

২০২১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে জিডিআই উপস্থাপন করেন। এই উদ্যোগ এসডিজির বিকল্প নয়; বরং দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, সবুজ উন্নয়ন, ডিজিটাল সংযোগ, শিল্পায়ন, জলবায়ু সহনশীলতা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ আটটি অগ্রাধিকারমূলক ক্ষেত্রের মাধ্যমে এসডিজিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে গড়ে উঠেছে। এসব অগ্রাধিকার বাংলাদেশের উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য এবং এসডিজির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে জিডিআইকে কেবল অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ তাৎপর্য ধরা পড়বে না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই উদ্যোগের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। অনেকের মতে, এটি বৈশ্বিক উন্নয়নে চীনের ভূমিকা সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। একই সঙ্গে এটিও উল্লেখযোগ্য যে জিডিআই গণতান্ত্রিক শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা, নাগরিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের মতো পশ্চিমা উন্নয়ন সহযোগীদের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মূল্যবোধকে প্রধান বিবেচ্য হিসেবে তুলে ধরে না, যদিও দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো ঋণের টেকসইতা ও আর্থিক স্বচ্ছতা। চীন ঋণ ফাঁদের ধারণা প্রত্যাখ্যান করলেও বাস্তবে বহু দেশ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য চীনা ঋণের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ঋণের শর্ত, দরপত্র প্রক্রিয়া, সুদের হার এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে এখনো নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতার পরিচয় দিলেও ভবিষ্যতের অর্থায়ন ব্যবস্থায় আরও বিচক্ষণতা প্রয়োজন। প্রতিটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা স্বাধীন আর্থিক মূল্যায়ন ও সংসদীয় পর্যালোচনার মাধ্যমে যাচাই করা হলে দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থ আরও সুরক্ষিত হবে।

পরিবেশগত টেকসইতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চীনা অর্থায়নে নির্মিত পরিবহন ও জ্বালানি প্রকল্প বহু দেশে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখলেও কিছু প্রকল্প পরিবেশগত প্রভাব, প্রতিবেশগত ক্ষতি ও শ্রমপরিবেশের কারণে সমালোচিত হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়ন কোনো বিকল্প নয়। তাই ভবিষ্যতের জিডিআই প্রকল্পগুলোকে জাতীয় পরিবেশগত বিধিমালা, আন্তর্জাতিক টেকসইতার মানদণ্ড এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

অবকাঠামো বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধি নিশ্চিত করাও জরুরি। বাংলাদেশি শ্রমিক, প্রকৌশলী, ঠিকাদার এবং স্থানীয় কোম্পানিগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে এসব প্রকল্পের সুফল দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হবে। একই সঙ্গে সুশাসনকে উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সড়ক, বন্দর, শিল্পপার্ক কিংবা ডিজিটাল নেটওয়ার্কের সফল ব্যবহার নির্ভর করে দক্ষ প্রশাসন, স্বচ্ছ ক্রয়ব্যবস্থা, কার্যকর আইনি কাঠামো ও নির্ভরযোগ্য নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার ওপর। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানই নির্ধারণ করবে বহিরাগত বিনিয়োগ কতটা স্থায়ী অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তথ্যের স্বচ্ছতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বহু চীনা ওভারসিজ প্রকল্পে তথ্যের সীমিত প্রাপ্যতা লক্ষ্য করা গেছে। এমনকি তথ্য প্রকাশিত হলেও অর্থায়ন ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিস্তারিত উপাত্ত স্বাধীন গবেষকদের জন্য সহজলভ্য হয়নি। অথচ প্রকল্প, ক্রয়, পরিবেশগত মূল্যায়ন ও আর্থিক তথ্য উন্মুক্ত থাকলে জনআস্থা যেমন বাড়বে, তেমনি জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হবে এবং নীতিনির্ধারণ আরও কার্যকর হবে।

অর্থনৈতিক বিষয়ের পাশাপাশি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাও বাংলাদেশের বিবেচনায় রাখতে হবে। দক্ষিণ এশিয়া বর্তমানে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কৌশলগত প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। জিডিআই-এর মাধ্যমে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান সম্পর্ক সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৃষ্টিতে না দেখে জাতীয় স্বার্থভিত্তিক, বাস্তববাদী ও বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পথ। এতে কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় থাকবে এবং কোনো একক শক্তির ওপর অতিনির্ভরতার ঝুঁকি কমবে। ইন্দো-প্যাসিফিক ও বঙ্গোপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশের জন্য এই ভারসাম্য রক্ষা অপরিহার্য।

সবশেষে বলা যায়, জিডিআই বাংলাদেশের জন্য অবকাঠামো, প্রযুক্তি, ডিজিটালাইজেশন, জলবায়ু অভিযোজন ও দারিদ্র্য বিমোচনে নতুন সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তব সুফলে রূপ দিতে আর্থিক ঝুঁকি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, পরিবেশগত মানদণ্ড, স্বচ্ছতা এবং ভূ-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। উদ্যোগটির সাফল্য মূলত নির্ভর করবে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর নীতিনির্ধারণের ওপর, উদ্যোগটির ওপর নয়। তাই জিডিআই কাঠামোর প্রতিটি প্রকল্পে উন্মুক্ত তথ্যপ্রকাশ, কার্যকর ঋণ ব্যবস্থাপনা, প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়প্রক্রিয়া, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি নিশ্চিত করা জরুরি। এসব শর্ত পূরণ করা গেলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, কৌশলগত স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের লক্ষ্য অক্ষুণ্ণ রেখেই সর্বোচ্চ উন্নয়ন সুবিধা অর্জন সম্ভব হবে। আর এই নতুন পরাশক্তির প্রতিযোগিতার যুগে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে আত্মবিশ্বাসী, বিচক্ষণ ও জাতীয় স্বার্থনির্ভর উন্নয়ননীতি, যেখানে ভূ-রাজনীতির চেয়ে নাগরিকের কল্যাণই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়।

লেখক: ড. সুজিত কুমার দত্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এবং হংকং রিসার্চ সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ বাংলাদেশ সেন্টারের পরিচালক। তিনি চীনের শানডং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফেলোশিপ এবং গবেষণা কার্যক্রমের সাথে যুক্ত রয়েছেন।

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪