| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

রংপুরে চার খুনের রহস্যে নতুন মোড়

রাত ২টা ৪০ মিনিটে বোনকে ফোন করেছিলেন নিহত প্রীতিলতা

reporter
  • আপডেট টাইম: অগাস্ট ২৮, ২০২৬ ইং | ১২:১৫:১৪:অপরাহ্ন  |  ৩৮৩ বার পঠিত
রাত ২টা ৪০ মিনিটে বোনকে ফোন করেছিলেন নিহত প্রীতিলতা

রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় রহস্য যেন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক বিবৃতির সঙ্গে সংগৃহীত তথ্যের একাধিক অসংগতি ও অমিল খুঁজে পেয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের সময়রেখা, ফরেনসিক আলামত, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা এবং অভিযুক্তদের কথিত গতিবিধি নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে সংস্থাটি।

আসকের মতে, ঘটনাটির প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটনে কোনো অনুমাননির্ভর বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত প্রমাণের ভিত্তিতে পুরো ঘটনাটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা জরুরি। বিশেষ করে নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর মুঠোফোন থেকে রাত ২টা ৪০ মিনিটে তার বোনের নম্বরে যাওয়া একটি কলের বিষয়টি তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) প্রকাশিত আসকের প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। এর আগে সংস্থাটির দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গত ২৪ ও ২৫ আগস্ট রংপুরে সরেজমিনে তথ্যানুসন্ধান চালায়। এ সময় তারা নিহতদের স্বজন, প্রতিবেশী, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার, স্থানীয় থানা-পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), মর্গ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন।

আসকের তথ্যানুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে এসেছে, সেটি হলো ঘটনার রাতের সময়রেখা। নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২০ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে তার বোনের সঙ্গে স্বাভাবিক কথাবার্তা হয়েছিল। কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টা পর, রাত ২টা ৪০ মিনিটের দিকে প্রীতিলতার মুঠোফোন থেকেই পূজার নম্বরে একটি কল আসে। তবে সে সময় পূজা ওই ফোনকলটি ধরতে পারেননি।

এই ফোনকল ঘিরেই এখন তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন রাত ২টা ৪০ মিনিটে প্রীতিলতার ফোন থেকে আসা কলটি আসলে কে করেছিলেন? তখন মুঠোফোনটি কোথায় ছিল? ফোনটি কি প্রীতিলতার কাছেই ছিল, নাকি অন্য কারও হাতে? কলটি করার সময় ওই ব্যক্তির অবস্থান কী ছিল? আর সেই কলের পর ঠিক কখন পরিবারের সদস্যদের ফোনগুলো বন্ধ হয়ে যায়?

অন্যদিকে পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ রাতের দিকে অভিযুক্তরা বাসার ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবনের সময় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। এরপর ভোরের দিকে পরিবারের সদস্যদের হত্যার ঘটনা ঘটে।

আসকের মতে, পুলিশের বর্ণিত সময়রেখার সঙ্গে রাত ২টা ৪০ মিনিটের এই ফোনকলের কোনো অসংগতি বা সময়গত গরমিল রয়েছে কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), মুঠোফোনের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এবং ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

পুলিশ কমিশনারের দাবি অনুযায়ী, মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে চারজনকে একে একে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এরপর হত্যাকাণ্ডের পরও অভিযুক্তরা ওই বাসায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করে এবং সেখানে খাবার খেয়েছিল।

তবে পুলিশের এই বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ফরেনসিক পরীক্ষার ওপর জোর দিয়েছে আসক।

মানবাধিকার সংগঠনটির প্রশ্ন, যদি অভিযুক্তরা সত্যিই হত্যার পর দীর্ঘ সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করে থাকে এবং সেখানে খাবার খেয়ে থাকে, তাহলে তাদের উপস্থিতির চিহ্ন কোথায়? ঘরের আসবাবপত্র, রান্নাঘর, খাবারের পাত্র, বাথরুমসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থান থেকে ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, ত্বকের কোষ, চুল কিংবা অন্যান্য জৈবিক আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে কি না, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

সংস্থাটির মতে, এসব আলামত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের বক্তব্য এবং পুলিশের বর্ণিত ঘটনার সঙ্গে সেগুলোর মিল রয়েছে কি না, তা আদালতের সামনে উপস্থাপন করা জরুরি।

চার হত্যাকাণ্ডের রাতে পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে আসক। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সিসিটিভি ক্যামেরার নজর এড়ানোর উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়ে থাকতে পারে।

তবে আসকের প্রশ্ন, ঠিক কখন বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল? কীভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়? কারা সেটি করেছিল? বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় এবং হত্যাকাণ্ডের সময়ের মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না?

সংস্থাটির মতে, এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমানের ভিত্তিতে নয়, বরং প্রযুক্তিগত প্রমাণের মাধ্যমে বের করা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময়, সিসিটিভির শেষ কার্যক্রম এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের তথ্য বিশ্লেষণ করলেই এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যেতে পারে।

তথ্যানুসন্ধানের অংশ হিসেবে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেছেন আসকের প্রতিনিধিরা। এ সময় সিদ্ধার্থের বাবা তাঁর ছেলেকে আটকের সময় পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টি উল্লেখ করে ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অপর অভিযুক্ত সীমান্তের পরিবারের সদস্যরাও তাদের বক্তব্য আসকের প্রতিনিধিদের কাছে তুলে ধরেন।

তবে পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া এসব বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করাও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করছে সংস্থাটি। কারণ প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগীর স্বজন এবং অভিযুক্তদের পরিবারের বক্তব্যের সঙ্গে প্রযুক্তিগত ও ফরেনসিক প্রমাণের মিল-অমিল বের করা গেলেই ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সঙ্গে আসক প্রতিনিধিরা সরাসরি কথা বলতে না পারলেও মর্গের কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। মর্গের সহকারীরা মরদেহে পচনের লক্ষণ ও আঘাতের কথা জানিয়েছেন। তবে তারা মরদেহে যৌন নির্যাতনের দৃশ্যমান কোনো আলামত দেখেননি বলেও জানান।

তবে আসক বলছে, মর্গের কর্মীদের চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, আঘাতের ধরন, নির্যাতনের কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সিআইডির ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলাফল এবং ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিক রাসায়নিক প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ, মরদেহের ওপর দৃশ্যমানভাবে কোনো আলামত পাওয়া গেছে বা যায়নি শুধু তার ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব নয় বলেই মনে করছে মানবাধিকার সংগঠনটি।

রংপুর ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। বিভ্রান্তি এড়াতে বিভিন্ন আলামত যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

তবে আসকের মতে, এত বড় একটি হত্যাকাণ্ডের পর সাধারণ মানুষের মনে যে সংশয় তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে তদন্তকে হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক। বিশেষ করে রাত ২টা ৪০ মিনিটের ফোনকল, হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট সময়, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা, অভিযুক্তদের কথিত অবস্থান এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া ফরেনসিক আলামত প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

সংস্থাটির ভাষ্য, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে কোনো একটি বক্তব্য বা প্রাথমিক ধারণার ওপর নির্ভর করা যাবে না। বরং সিসিটিভি, কল ডিটেইল রেকর্ড, ডিজিটাল ফরেনসিক, ডিএনএ ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক আলামত মিলিয়ে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সময়রেখা তৈরি করতে হবে।

আর সেই সময়রেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন থেকেই সামনে রাত ২টা ৪০ মিনিটে নিহত প্রীতিলতার ফোন থেকে তাঁর বোন পূজার কাছে যে কলটি গিয়েছিল, সেটি করেছিলেন কে?


রিপোর্টার্স২৪/ঝুম

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪