আশিস গুপ্ত, নয়াদিল্লি: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং স্থায়ী জলমগ্নতার কারণে কলকাতা, মুম্বই এবং ঢাকার মতো দক্ষিণ এশিয়ার নিম্নঞ্চলীয় শহরগুলির ১ কোটি ৪০ লক্ষেরও বেশি মানুষ তাঁদের ঘরবাড়ি, জীবিকা এবং জীবন হারানোর তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছেন।
রাষ্ট্রপুঞ্জের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই আশঙ্কাজনক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। 'চ্যালেঞ্জেস রিলেটেড টু সি লেভেল রাইজ অ্যান্ড ওয়েজ অ্যান্ড অ্যাপ্রোচেস টু অ্যাড্রেস ইট' শীর্ষক এই বিশেষ প্রতিবেদনটি ৩১ আগস্ট পালাউয়ে অনুষ্ঠিত ৫৫তম প্যাসিফিক আইল্যান্ডস ফোরাম লিডার্স মিটিংয়ে পেশ করেন রাষ্ট্রপুঞ্জের উপ-মহাসচিব আমিনা জে মোহাম্মদ।
এতে জানানো হয়, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতি বছর গড়ে ৪.৭ মিলিমিটার করে বেড়েছে এবং ২০২৪ সালে তা রেকর্ড ৫.৯ মিলিমিটারে পৌঁছেছে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা মেনে নির্গমন কমানো সম্ভব হলেও হিমবাহ ও বরফের চাদর গলন এবং মহাসাগরের উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রের জলস্তর দ্রুত গতিতে বাড়তেই থাকবে।
জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি) পূর্বাভাস দিয়েছে যে, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন সর্বনিম্ন থাকলেও ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা ০.২৩ মিটার এবং ২১০০ সালের মধ্যে তা ০.২৮ থেকে ০.৫৫ মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে উচ্চ নির্গমনের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি ০.৬৩ থেকে ১.০১ মিটারে পৌঁছাতে পারে। সবথেকে খারাপ পরিস্থিতিতে চলতি শতাব্দীর শেষের দিকে সমুদ্রের জলস্তর প্রায় ২ মিটারের কাছাকাছি বেড়ে যাওয়ার মতো আশঙ্কাজনক চিত্রও তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি এখন আর ভবিষ্যতের হুমকি নয়, বরং এক নিকটবর্তী বাস্তবতা। কলকাতা, মুম্বই ও ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের জন্য মূল বিপদ কেবল উপকূলীয় জমি হারিয়ে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা ব্যাপক হারে মানুষের বাস্তুচ্যুতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের হিসাব অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারেন। বারবার বন্যার ফলে পরিবহণ ব্যবস্থা, শক্তি অবকাঠামো, পানীয় জল সরবরাহ এবং নগর কাঠামোর মারাত্মক ক্ষতি হবে। এছাড়া নোনা জল ভূগর্ভস্থ সুপেয় জলে মিশে পানীয় জল ও কৃষি ব্যবস্থার ক্ষতি করবে, বাড়াবে জলবাহিত রোগের প্রকোপ ও মানসিক চাপ।
বর্তমানে বিশ্বের ১০ শতাংশ মানুষ (প্রায় ৭৭ কোটি) সমুদ্রের উচ্চ জোয়াররেখা থেকে ৫ মিটারের কম উচ্চতায় বসবাস করছেন। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই প্রভাব হবে অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক। উপকূলীয় অবকাঠামোর ক্ষতির পরিমাণ বিশ্বব্যাপী ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের এই বৃদ্ধি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, সুপেয় জল ও খাদ্য সুরক্ষার মতো মৌলিক অধিকারকেও বিপন্ন করছে। পাশাপাশি নিজের জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক পরিচয়ও সংকটে পড়ছে।
রাষ্ট্রপুঞ্জ জানিয়েছে, শুধু অভিযোজন দিয়ে উচ্চ উষ্ণায়ন রোধ করা সম্ভব নয়; এর জন্য দ্রুত নির্গমন কমানোর পাশাপাশি কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা (যেমন ম্যানগ্রোভ পুনরুজ্জীবন) গড়ে তোলা প্রয়োজন। হিমালয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিও এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। গত সপ্তাহে নেপালের লাংটাং লিরুং-এর কাছে হিমবাহ ধসে তৈরি বিধ্বংসী বন্যায় ১,০০০-এরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। নেপাল, চীন ও ভারতে ছড়িয়ে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদগুলি এখন দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বড় হুমকি।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, একদিকে কলকাতা ও মুম্বইয়ের মতো শহরের স্থায়ী জলমগ্নতার ঝুঁকি এবং অন্যদিকে হিমালয় অঞ্চলের আকস্মিক হিমবাহ বন্যা—সব মিলিয়ে প্রাথমিক সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, স্থিতিস্থাপক পরিকাঠামো নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন আর বিলম্ব করার মতো বিষয় নয়।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব