রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: নব্বই দশকে ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় খল অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে পাঁচ দিন হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে তার কাছ থেকে মৃত্যু রহস্যের বিষয়ে বড় কোনো তথ্য আদায় করতে পারেনি সংস্থাটি।
পলাতক আসামিদের চিনলেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়নি ডন। সালমান শাহর বন্ধু ডনকে ফের রিমান্ডে নেওয়া হতে পারে বলেও জানিয়েছে সিআইডি।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ৫ দিনের রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করে সিআইডি। সেই সঙ্গে তাকে কারাগারে রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক মো. মুজিবুর রহমান। সে আবেদনেই দাবি করা হয়, ডন মামলার অনেক কিছুই লুকাচ্ছেন।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়, সালমান শাহর মৃত্যুর বিষয় ও মামলার ঘটনা সংক্রান্তে ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি অত্যন্ত কৌশলে কথা বলেন। আসামি অত্যন্ত চতুর ও দুর্দান্ত প্রকৃতির লোক হওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন। পলাতক আসামিদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ডন তাদের চেনেন বলে স্বীকার করলেও অনেক তথ্য গোপন করছেন। অথচ সালমান শাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে একত্রে চলাফেরা করার কারণে তার সব তথ্য জানার কথা। কিন্তু ডন অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই গোপন করেছেন।
তবে মামলার ঘটনার পূর্বে, পরে ও ঘটনার সময় আসামির আচার-আচরণে, চালচলনে মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে অনেক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তাই তাকে আবার জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হতে পারে। সে কারণে তাকে কারাগারে রাখার আরজি তিনি জানান আদালতে। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা ডনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
৩০ বছর আগে সালমান শাহ মারা যাওয়ার আগে খলনায়ক হিসেবে ডন তার সঙ্গে বেশ কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। পাশাপাশি দুজনের বন্ধুত্বও ছিল আলোচিত। সালমান শাহর মৃত্যুর পর তা আত্মহত্যা বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল, মামলা হয়েছিল অপমৃত্যুর। থানা পুলিশ, পিবিআই, সিআইডির পাশাপাশি বিচার বিভাগীয় তদন্তেও তা আত্মহত্যা বলেই উঠে আসে।
কিন্তু তার মা নীলা চৌধুরীর দাবি ছিল ভিন্ন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া পেরিয়ে ২৯ বছর পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর আদালত অপমৃত্যুর মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
সেই নির্দেশের পর নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। সেই মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক ও খলনায়ক ডনসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়।
গত ৯ আগস্ট ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এই মামলায় ডনের পাশাপাশি আসামি রয়েছেন- সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক, সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেবিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু, রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর মৃত্যু ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। তখন বলা হয়েছিল, সাংসারিক জটিলতার কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। ঢাকার ইস্কাটনে নিজের বাড়িতে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় সালমান শাহর লাশ উদ্ধারের পর অপমৃত্যুর মামলা করেছিলেন তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই অভিযোগটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করা হয়।
এ বিষয়ে তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। তদন্ত শেষে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। তাতে এ ঘটনাকে আত্মহত্যা বলা হয়।
পরে ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন গৃহীত হয়। তবে প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করেন কমরউদ্দিন চৌধুরী। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান আদালত।
দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট আদালতে বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করেন তৎকালীন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক। ওই প্রতিবেদনেও একে আত্মহত্যা বলা হয়েছিল।
এদিকে কমরউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর মামলার বাদী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন নীলা চৌধুরী। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করেন।
এরপর পিবিআই আসে এই মামলার তদন্তে। তারাও উপসংহারে পৌঁছায় যে ঘটনাটি আত্মহত্যা। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর আদালত ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলাটি নিষ্পত্তি করেন।
কিন্তু ২০২২ সালের ১২ জুন সেই আদেশের বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন মামলা দায়ের করেন নীলা চৌধুরী। এরপর গত বছরের ২০ অক্টোবর অপমৃত্যুর মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন আদালত। সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুম হত্যা মামলা করার পর তদন্তভার দেওয়া হয় সিআইডিকে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম