বগুড়া প্রতিনিধি: বগুড়া শহরের মালগ্রাম মধ্যপাড়া দীঘিপাড় এলাকার ধানখেত থেকে গত ১২ আগস্ট যে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল, তাঁর পরিচয় মিলেছে। নিহত ব্যক্তি বগুড়া মহানগরের সুত্রাপুর এলাকার ফল ব্যবসায়ী ওয়াহেদ হোসেন ওরফে নিঝুম (৩৭)।
ধার দেওয়া টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে বিরোধের জেরে ওয়াহেদকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তাঁর দুই বন্ধু নাজিম উদ্দিন ও মো. স্বপন।
পুলিশ বলছে, নাজিম ইন্টারনেটে অজ্ঞান করার ওষুধের নাম খুঁজে বের করেন। পরে কর্মস্থলে ডেকে নিয়ে কোমল পানীয়র সঙ্গে চেতনানাশক ও বিষাক্ত দ্রব্য মিশিয়ে ওয়াহেদকে পান করানো হয়। একপর্যায়ে তাঁর মৃত্যু হলে লাশ বস্তায় ভরে ধানখেতে ফেলে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার ওয়াহেদের ভাই সোহেল হোসেন বগুড়া সদর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলার পর কাহালু উপজেলার মদনাই গ্রাম থেকে নাজিমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বিকেলে তাঁকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হলে বগুড়ার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুল ইসলাম পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নাজিম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় তাঁর বন্ধু স্বপনও জড়িত বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওয়াহেদ স্টেশন সড়কে তাঁর বাবার সঙ্গে ফলের আড়ত পরিচালনা করতেন। নাজিম ও স্বপন একটি বেসরকারি সংস্থায় বাবুর্চি হিসেবে কাজ করতেন। তাঁদের সঙ্গে ওয়াহেদের বন্ধুত্ব ছিল।
কিছুদিন আগে ওয়াহেদ তার মায়ের নামে ওই বেসরকারি সংস্থা থেকে সাত লাখ টাকা ঋণ নেন। এর মধ্যে দুই লাখ টাকা স্বপনকে এবং এক লাখ টাকা নাজিমকে ধার দেন। পরে ধার দেওয়া টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে নাজিম বলেছেন, ওই বিরোধের জেরে ওয়াহেদকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি ও স্বপন। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ৭ আগস্ট ওয়াহেদকে মালগ্রাম এলাকার ওই বেসরকারি সংস্থার কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়।
সেখানে নাজিম তাঁর মুঠোফোনে ইন্টারনেটে অজ্ঞান করার ওষুধের নাম খোঁজেন। এরপর কোমল পানীয়র সঙ্গে চেতনানাশক ও বিষাক্ত দ্রব্য মিশিয়ে ওয়াহেদকে পান করানো হয়। কিছুক্ষণ পর ওয়াহেদ মারা গেলে রাতে তাঁর লাশ বস্তায় ভরে কার্যালয় থেকে কিছু দূরের একটি ধানখেতে ফেলে রাখা হয়।
পরদিন ৮ আগস্ট সকালে নাজিম ও স্বপন তাঁদের কর্মস্থল থেকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ওয়াহেদ নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর পরিবার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। নিখোঁজের পাঁচ দিন পর ১২ আগস্ট মালগ্রাম মধ্যপাড়া দীঘিপাড় এলাকার একটি ধানখেত থেকে বস্তাবন্দী অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তখন লাশটির পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। পরে ওয়াহেদের স্বজনেরা লাশটি শনাক্ত করেন।
পুলিশ জানায়, লাশ উদ্ধারের পর ওয়াহেদের মুঠোফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করে নাজিম ও স্বপনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যায়। এরপর তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাঁদের শনাক্ত করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়।
বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহীম আলী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত করে নাজিম ও স্বপনকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। নাজিমকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর কাছ থেকে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বগুড়া সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শরিফুল ইসলাম বলেন, নাজিমকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। স্বপনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
বগুড়ার পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ বলেন, নাজিম প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের আগে ইন্টারনেটে অজ্ঞান করার ওষুধের নাম খোঁজার কথা জানিয়েছেন। হত্যায় ব্যবহৃত দ্রব্য, হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এবং স্বপনের ভূমিকা সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে তদন্ত চলছে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম