| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

চকবাজারে আগুনে সর্বস্ব হারানোর শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা

reporter
  • আপডেট টাইম: অক্টোবর ১৩, ২০২৬ ইং | ১০:৫৭:৫২:পূর্বাহ্ন  |  ৬৩ বার পঠিত
চকবাজারে আগুনে সর্বস্ব হারানোর শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা

রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের ছোট কাটারা গলির মনসুর খান প্লাজায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিঃস্ব হওয়ার শঙ্কায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। ভবনটির ছয়তলায় থাকা দোকান ও গোডাউনের মালামাল আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারায় নিজেদের গোডাউনের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছেন না তারা। কারও গোডাউনে ছিল প্রায় ৪০ লাখ টাকার ব্যাগ, আবার কারও রয়েছে কোটি কোটি টাকার কসমেটিকস ও অন্যান্য পণ্যের মজুত। আগুনে সারা জীবনের পুঁজি হারানোর আশঙ্কায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন ব্যবসায়ীরা। এর পাশাপাশি নিরাপত্তার কারণে আশপাশের একাধিক ভবন ও দোকান বন্ধ থাকায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালেও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সামনে ব্যবসায়ীদের উৎকণ্ঠিত অবস্থায় অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কখন ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে নিজেদের মালামালের অবস্থা দেখতে পারবেন, সেই অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। কারও চোখেমুখে হতাশা, কারও মনে শেষ সম্বলটুকু ফিরে পাওয়ার আকুতি। আগুনে কতটুকু ক্ষতি হয়েছে, তা জানার আগেই অনেকের মনে তৈরি হয়েছে সর্বস্ব হারানোর ভয়।

মনসুর খান প্লাজার ছয়তলায় গোডাউন রয়েছে ব্যবসায়ী মো. রবিনের। সেখানে প্রায় ৪০ লাখ টাকার ব্যাগ মজুত ছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। আগুনের ঘটনায় তার গোডাউনের সব মালামাল পুড়ে গেছে কি না, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন এই ব্যবসায়ী।

রবিন বলেন, আগুন লাগা ভবনটি সাততলা। ভবনটির পাঁচ, ছয় ও সাততলায় কসমেটিকস পণ্য ও ব্যাগের গোডাউন রয়েছে। তাঁদের গোডাউন ছয়তলার ডান পাশে। আগুনও ছয়তলায় লেগেছে। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে এখনো ভবনের ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, ‘আমাদের গোডাউনে প্রায় ৪০ লাখ টাকার ব্যাগ ছিল। এখন যদি সব পুড়ে যায়, তাহলে আমি সর্বস্বান্ত হয়ে যাব।’

রবিন আরও জানান, ভবনটির পাঁচ, ছয় ও সাততলায় ৫০টির বেশি গোডাউন রয়েছে। প্রতিটি গোডাউনে আনুমানিক ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকার মালামাল মজুত থাকে। অন্যদিকে, ভবনের নিচের তলাগুলোতে ব্যাগ ও কসমেটিকসের দোকান রয়েছে। ফলে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত মালামালের আর্থিক মূল্য অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

আগুন লাগার খবর পাওয়ার বিষয়ে রবিন বলেন, পাঁচ ও ছয়তলায় গোডাউন থাকায় সেখানে সাধারণত কেউ অবস্থান করেন না। মালামাল আনা-নেওয়া বা প্রয়োজনীয় কাজের জন্য ব্যবসায়ীরা সেখানে যান। সোমবার বিকেল ৫টার দিকে নিচতলার একটি দোকানের কর্মচারীর মাধ্যমে তিনি আগুন লাগার খবর পান। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি।

ভবনের নিচতলায় ব্যাগের দোকান রয়েছে ব্যবসায়ী মো. ইমতিয়াজের। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কার পাশাপাশি আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের কার্যক্রম নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি।

ইমতিয়াজের অভিযোগ, সোমবার বিকেল ৫টার দিকে আগুন লাগার পর মঙ্গলবার সকাল ১০টা পর্যন্ত ভবন থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। এত দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বলতে থাকায় বিপুল পরিমাণ মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন অবস্থা হয়েছে, সকালে মালিক, বিকেলে ফকির। ফায়ার সার্ভিসের গাফিলতির কারণে আগুন এখন পর্যন্ত জ্বলছে।’

ইমতিয়াজের দাবি, ভবনটিতে কোটি কোটি টাকার মালামাল ছিল। আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব না হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় উন্নত বিশ্বের মতো আধুনিক ও কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম আনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

তবে ফায়ার সার্ভিসের গাফিলতির বিষয়ে ব্যবসায়ীদের অভিযোগের স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সরু রাস্তা ও ভবনের কাঠামোগত জটিলতার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের অন্যান্য গোডাউনের মালিকদের মধ্যেও বিরাজ করছে চরম অনিশ্চয়তা। আগুন ছয় ও সাততলায় ছড়িয়ে পড়ায় তাদের মজুত করা মালামালের বড় অংশ পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কিন্তু ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

ব্যবসায়ীদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ব্যাগ, কসমেটিকস ও অন্যান্য পণ্যের ব্যবসা করে আসছেন। এসব গোডাউনে রাখা মালামালই তাদের ব্যবসার মূল পুঁজি। আগুনে সেসব পণ্য নষ্ট হয়ে গেলে নতুন করে ব্যবসা শুরু করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

ভবনের ছয়তলায় থাকা সব মালামাল পুড়ে যাওয়ার তথ্য জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। তবে অন্যান্য তলায় থাকা গোডাউনগুলোর কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিশ্চিত হতে ভবনের ভেতরে প্রবেশ এবং বিস্তারিত পরিদর্শন প্রয়োজন।

অগ্নিকাণ্ডের পর নিরাপত্তার স্বার্থে ছোট কাটারা গলির আশপাশের আরও ১০ থেকে ১৫টি ভবন বন্ধ করে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব ভবনে কসমেটিকসসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যের অসংখ্য দোকান রয়েছে। ফলে শুধু আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ব্যবসায়ীরাই নন, আশপাশের ব্যবসায়ীরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

দোকান বন্ধ থাকায় স্বাভাবিক বেচাকেনা করতে পারছেন না তারা। কখন দোকান খুলে আবার ব্যবসা শুরু করতে পারবেন, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। দীর্ঘ সময় দোকান বন্ধ থাকলে দৈনন্দিন বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য খরচ বহন করাও কঠিন হয়ে উঠবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

আগুন লাগা ভবনের পাশের একটি ভবনে কসমেটিকসের দোকান রয়েছে মোহাম্মদ সাইদুর রহমানের। অগ্নিকাণ্ডের কারণে তাঁর দোকানও বন্ধ রয়েছে।

সাইদুর রহমান বলেন, গতকাল বিকেল থেকে আমাদের দোকান বন্ধ। এত দীর্ঘ সময় দোকান বন্ধ থাকায় আমরা মারাত্মক ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। আমরা চাই, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হোক, যাতে আবার ব্যবসা করতে পারি।

মনসুর খান প্লাজার দারোয়ান মো. মজিবুল্লাহ জানান, সোমবার বিকেল ৫টার দিকে ভবনটিতে আগুন লাগে। আগুন নিয়ন্ত্রণের সময় ভবনের ভেতরে পানি দেওয়া হলেও ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে বলে দাবি করেন তিনি

মজিবুল্লাহ বলেন, গতকাল বিকেল ৫টায় আগুন লেগেছে। শুধু পানি দিয়ে বিল্ডিং ভরে ফেলছে। ভেতরে আগুন জ্বলছে, ধোঁয়া বের হচ্ছে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ভবনটিতে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম চলেছে। এ সময় ভবনের ভেতরে থাকা মালামাল ও গোডাউনগুলোর অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে চকবাজারের ছোট কাটারা গলির মনসুর খান প্লাজায় আগুন লাগার খবর পায় সংস্থাটি। খবর পাওয়ার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট।

দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালানোর পর মঙ্গলবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ফায়ার সার্ভিসের সদরদপ্তরের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট কাজ করেছে।

ফায়ার সার্ভিস আরও জানিয়েছে, আগুনে মার্কেটটির ছয়তলায় থাকা সব মালামাল পুড়ে গেছে। অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম চালানোর সময় তীব্র ধোঁয়ার কারণে ফায়ার সার্ভিসের দুই কর্মী অসুস্থ হয়ে পড়েন। সরু রাস্তা ও ভবনের কাঠামোগত জটিলতার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে উদ্ধারকর্মীদের বেগ পেতে হয়েছে।

দীর্ঘ সময়ের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও মনসুর খান প্লাজার ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা এখনো কাটেনি। গোডাউনের দরজা খুলে ভেতরে থাকা মালামাল পরীক্ষা করতে না পারায় নিজেদের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছেন না তারা। কারও কয়েক দশকের ব্যবসার পুঁজি, কারও পরিবারের জীবিকা, আবার কারও নতুন করে ব্যবসা শুরু করার স্বপ্ন সবকিছুই এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, দ্রুত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাদের ভবনের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে, যাতে তারা নিজেদের গোডাউন ও দোকানের অবস্থা দেখতে পারেন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ানো এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

চকবাজারের এই অগ্নিকাণ্ড আবারও পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তা, সরু সড়ক এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন সামনে এনেছে। আগুনে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে ব্যবসায়ীদের। তবে এরই মধ্যে তাঁদের অনেকের মনে একটাই ভয় দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়ে তোলা ব্যবসা ও সারা জীবনের পুঁজি আগুনে চিরতরে হারিয়ে গেল কি না।


রিপোর্টার্স২৪/ঝুম

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪