রাজবাড়ী প্রতিনিধি: রাজবাড়ীতে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণে তিন নারীর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সমালোচনার মধ্যে এবার কালুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ে ভুল রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে গিয়ে সাফিয়া খাতুন নামের এক অন্তঃসত্ত্বা নারী এ ভুল রিপোর্টের শিকার হন বলে অভিযোগ করেছে তাঁর পরিবার।
এ ঘটনায় কালুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইসরাত জাহান উম্মনের মন্তব্য ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ‘এ ধরনের ভুল স্বাভাবিক’ বলে মন্তব্য করেন বলেও জানা যায়।
ভুক্তভোগী পরিবারের সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি কালুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিত পরীক্ষার অংশ হিসেবে রক্ত পরীক্ষা করালে সাফিয়া খাতুনের রক্তের গ্রুপ ‘এ পজিটিভ’ (A+) উল্লেখ করে রিপোর্ট দেওয়া হয়। পরে রিপোর্টের যথার্থতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার দুটি পৃথক বেসরকারি ডায়াগনস্টিক ক্লিনিকে পুনরায় রক্ত পরীক্ষা করানো হয়। উভয় প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টে তাঁর রক্তের গ্রুপ ‘ও পজিটিভ’ (O+) উল্লেখ করা হয়।
একই ব্যক্তির রক্তের গ্রুপ নিয়ে সরকারি হাসপাতাল ও দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টে ভিন্ন তথ্য পাওয়ায় সাফিয়ার পরিবার উদ্বেগ ও মানসিক দুশ্চিন্তায় পড়ে।
চিকিৎসাসংশ্লিষ্টদের মতে, ভুল রক্তের গ্রুপের রিপোর্টের ভিত্তিতে রক্ত সঞ্চালন করা হলে রোগীর জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অন্তঃসত্ত্বা নারীর ক্ষেত্রে এ ধরনের ভুলের পরিণতি আরও গুরুতর হতে পারে।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, সরকারি হাসপাতালের এমন ভুলের কারণে তাঁদের দীর্ঘদিন ধরে মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালের ওপর আস্থা রেখে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। সেখানে রক্ত পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভুল হলে রোগীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
কালুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ল্যাবে কর্মরত ব্যক্তিরা দাবি করেন, অতিরিক্ত রোগীর চাপ ও জনবল সংকটের কারণে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত অসংগতি তৈরি হতে পারে।
অভিযুক্ত ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম বলেন, “সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সঠিক কাজ করার চেষ্টা করি। তবে রোগীর চাপ বেশি থাকলে কাজের কিছুটা ব্যত্যয় ঘটতে পারে।”
এদিকে, ভুল রিপোর্টের বিষয়ে জানতে চাইলে কালুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইসরাত জাহান উম্মন হেসে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ সময় তিনি বলেন, “এ ধরনের ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক, মানুষের তো ভুল হতেই পারে।” পাশাপাশি তিনি জানান, বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপের বিপরীতে হাসপাতালে মাত্র একজন ল্যাবকর্মী নিয়োজিত থাকায় এ ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
একজন সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তার এমন মন্তব্যে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় ভুলের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জনবল সংকট ও পরীক্ষাগারের কার্যক্রমে কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, তদন্তে দায়ীদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ভুল রিপোর্টের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
কালুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নির্ভুল স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানোরও দাবি উঠেছে।
এদিকে, রাজবাড়ী জেলায় সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসাসেবার মান ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষের কথা জানাচ্ছেন স্থানীয়রা। উল্লেখ্য, এর আগে রাজবাড়ীতে ভুল চিকিৎসা ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগের মধ্যে তিন নারীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। এসব ঘটনার পর চিকিৎসাসেবার মান, রোগীর নিরাপত্তা এবং অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব