স্টাফ রিপোর্টার: ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করার পরও শ্রমিকদের কাজে না ফেরা, হামলা ও ভাঙচুরের আতঙ্ক এবং মজুরি বাড়ানোর দাবিতে শ্রমিকদের অব্যাহত আন্দোলনের কারণে গতকাল সোমবারেও (২ নভেম্বর) টানা তৃতীয় দিনের মতো দেশের অন্তত ৬৯০টি তৈরি পোশাক কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।
পোশাক শিল্পের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানিয়েছে, এসব কারখানায় ১৭ লাখেরও বেশি শ্রমিক কাজ করেন।
এদিকে কারখানায় টানা উৎপাদনে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পণ্য পাঠানো বা শিপমেন্ট নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় পড়েছেন মালিকেরা।এর পাশাপাশি আগামী মাসগুলোতে শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধ করা এবং ব্যাংক ঋণ সামলানো নিয়ে চরম সংকটে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
অন্যদিকে, পোশাক পণ্যের নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার মূল সিজনেই এই সহিংসতা শুরু হওয়ায়— গোটা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও বিদেশি বায়াররা।
শ্রমিক অসন্তোষ ও তাদের সড়ক অবরোধের কারণে, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ শিল্পাঞ্চলগুলোর আশপাশের প্রধান প্রধান মহাসড়কে গতকাল যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচলও চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক খাতের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা—শ্রমিক প্রতিনিধি, কারখানা মালিক ও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন।
এসব বৈঠকে সরকার মালিকদের প্রতি কারখানা খোলা রাখার উদাত্ত আহ্বান জানায়। যার জবাবে মালিকরাও তাদের কারখানার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। যেসব কারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে; দোষীদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে—ওইসব কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে সিসিটিভি ফুটেজ চেয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
একই সময়ে মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি ও অধিকারকর্মীরা—বোর্ডের বৈঠক দ্রুত আহ্বান করে, অবিলম্বে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা এবং এর বাস্তবায়ন সুনিশ্চিত করার দাবি জানান। এর পাশাপাশি সাধারণ শ্রমিকদের কোনোপ্রকার উসকানিতে কান না দিয়ে অবিলম্বে কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তারা। কোনো নিরীহ শ্রমিক যাতে কেবল আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে পুলিশি হয়রানি বা গ্রেপ্তারের শিকার না হন—তা নিশ্চিত করারও তাগিদ দেন শ্রমিক নেতারা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম টিবিএসকে বলেন, "স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে আমাদের কারখানা খোলা রাখতে বলা হয়েছে। আমরা আগামী কালকের (মঙ্গলবার) পরিস্থিতি দেখব, এরপরও যদি কারখানায় শ্রমিকরা কাজ না করে, অথবা কারখানা ফের হামলার শিকার হয়, তাহলে পরবর্তীতে সভা করে সিদ্ধান্ত নেব।"
সিদ্ধান্ত কী হতে পারে, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, "আমরা শ্রম আইনের ১৩/১ ধারা অনুযায়ী অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধের দিকে যেতে পারি।"
এদিকে তৈরি পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ইন্ধনকে দায়ী করেছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পোশাক শিল্পে সহিংসতার নেপথ্যে কিছু কারখানা মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের সক্রিয় সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
পোশাক খাতের দুই শীর্ষ সংগঠনের নেতাদের সাথে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পোশাক কারাখানা মালিকদের কেউ কেউ অতীতে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। যেসব মালিক উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারখানা বন্ধ রেখেছেন, তাঁদের একটি তালিকা সরকারের কাছে জমা দিতে রাজি হয়েছেন অন্য মালিকরা।
তিনি বলেন, "শ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি পূরণ হয়েছে। এরপরও আন্দোলনের নামে সড়ক–মহাসড়কে অস্থিরতা ও সহিংসতা সৃষ্টির পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। সীমান্তের ওপারের শক্তির ইন্ধনে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। সরকার এসব ষড়যন্ত্রকারীদের কঠোর হস্তে দমন করবে।" এছাড়া কিছু মুখোশধারী উসকানিদাতা আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করেছে বলেও জানান তিনি।
৬৯০ কারখানা বন্ধ, সবচেয়ে বেশি গাজীপুরে
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট মিজানুর রহমান টিবিএসকে নিশ্চিত করেন যে, শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে অস্বীকার করায় কেবল বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ৬৭০টি কারখানায় উৎপাদন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রাখা হয়েছে।
বিকেএমইএর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জে আরও অন্তত ২০টি বড় কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে, যার ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক।
বিজিএমইএ-র অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গাজীপুর ও ময়মনসিংহে শ্রম অসন্তোষের প্রভাব ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। হামলা ও ভাঙচুরের আতঙ্কে কিংবা শ্রমিকরা কাজে না আসায়—এই অঞ্চলে মোট ৩৮২টি কারখানা গতকাল সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল, যেগুলোতে প্রায় ৯ লাখ শ্রমিক কাজ করেন।
এ ছাড়া সাভারের আশুলিয়া ও জিরাবো এলাকার ২২৩টি কারখানা, ঢাকার মিরপুরের ৬৫টি কারখানা এবং নারায়ণগঞ্জের প্রায় ২০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান টিবিএসকে জানান, "নারায়ণগঞ্জ এলাকায় তুলনামূলক বড় কারখানাগুলোর উৎপাদনও বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন মালিকেরা।"
উসকানিতে পা দেবেন না, কাজে ফিরুন: শ্রমিক নেতাদের আহ্বান
শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ে মজুরি বোর্ডে অন্তর্ভূক্ত হওয়া শ্রমিক নেতারা কাজ করবেন জানিয়ে—শ্রমিকদের কোন ধরণের উসকানিতে পা না দিয়ে কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা। সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে অনুষ্ঠিত সভায় মজুরি বোর্ডের সদস্য ও শ্রমিক নেতা বাবুল আক্তার শ্রমিকদের প্রতি এ আহ্বান জানান।
এর আগে একইদিন এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রয়োজন হলে আমরা আপনাদের আন্দোলনে ডাকব। তিনি বলেন, "দ্রুত মজুরি বোর্ডের সভা করে, প্রয়োজন হলে দিনে এবং রাতেও সভা করে ডিসেম্বরের মধ্যে মজুরি ঘোষণা করার লক্ষ্যে আমরা কাজ করবো।"
একই আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার এবং শ্রমিক অধিকারকর্মী নাজমা আক্তার তাদের নিজ নিজ অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিও বার্তার মাধ্যমে শ্রমিকদের শান্ত হয়ে উৎপাদন কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
মিরপুরের সহিংসতার ঘটনায় ৫ মামলা, গ্রেপ্তার ৬০
পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর মিরপুরে পুলিশের ওপর হামলা, ট্রাফিক বক্স ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পৃথক পাঁচটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় গত দুই দিনে অন্তত ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্ত ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মী ও সক্রিয় সদস্য রয়েছেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার গত রাতে টিবিএসকে নিশ্চিত করেছেন যে, আরও মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
একাধিক স্থানে নতুন করে সহিংসতা
গতকালও ঢাকার মিরপুরে চলমান আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে দুটি বড় তৈরি পোশাক কারখানায় হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে।
এদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিরপুর-২ নম্বরের বড়বাগ এলাকায় অবস্থিত সিরাজগঞ্জ ফ্যাশন লিমিটেড এবং দেশন অ্যাপারেলস-এ এই হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
একই সময়ে সাভার ও গাজীপুরে একাধিক যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালানো হয়। শ্রমিকরা গাজীপুরের দুটি প্রধান মহাসড়ক পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে ফেলে এবং মিরপুর ও আশুলিয়ার রাস্তায় নতুন করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব