শিমুল চৌধুরী ধ্রুব: ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা কয়েকজন তরুণের নেতৃত্বে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দেশে নতুন ধারার রাজনীতি চালুর অঙ্গীকার করেছিলেন তারা। তবে আট মাস পরে দলটি কোথায় দাঁড়িয়ে,এ নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। তবে এখনও সারাদেশে কমিটি দিতে পারেনি এনসিপি।
দলীয় নিবন্ধনকে কেন্দ্র করে ১ জুন ঢাকা মহানগর উত্তরে সমন্বয় কমিটি গঠনের মধ্যদিয়ে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন শুরু হয়। এখন পর্যন্ত দেশের ৩৩টি জেলা ও প্রায় ২০০টি উপজেলায় সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে এনসিপি’র ভেতরে মতপার্থক্য ও দ্বন্দ্ব ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নীতি ও আদর্শকে পছন্দ না করে দল ছেড়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ। তারা নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের চিন্তাও করছেন বলে শোনা যাচ্ছে। এমনকি গুঞ্জন উঠেছে নতুন দলের নাম হতে পারে ‘এনটিএ’।
ইতোমধ্যে যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায়, উত্তরাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক অলিক মৃ, যুগ্ম সদস্য সচিব তুহিন খানসহ বেশ কয়েকজন নেতা এনসিপি ছেড়েছেন। আরও বেশ কয়েকজন নেতাও দল ছাড়ার অপেক্ষায় আছেন।
একটি সূত্র জানায়, নতুন রাজনৈতিক দল ‘এনটিএ’র নেতৃত্বে থাকবেন একজন তরুণ উপদেষ্টা। তিনি উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করে দলটির প্রধানের দায়িত্ব নিবেন।
এনসিপির একজন যুগ্ম সদস্য সচিবও দলের ভেতর মতবিরোধের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে তিনি রিপোর্টার্স২৪-কে বলেন, ‘দলের মধ্যে ব্যক্তি স্বার্থ দলের স্বার্থের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তিগত অর্জনের জায়গাটা অনেকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, দলের লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন না। এ কারণেই অনেকে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে। যেভাবে আমাদের বলা হয়েছিল, সেই প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্যই গ্রুপভিত্তিক অসন্তুষ্টি তৈরি হচ্ছে।’
সম্প্রতি খাগড়াছড়ি ইস্যুতে এনসিপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দলটির উত্তরাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন অলিক মৃ। তিনি বলেন, ‘এনসিপি আসলে মধ্যপন্থী দল না হয়ে বরং ধীরে ধীরে ডানপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানের দিকে ঝুঁকছে।’
অন্য নেতারাও কি এই উপলব্ধি থেকেই দল ছেড়েছেন? এই প্রশ্নে তিনি আরও বলেন, ‘কে কোন কারণে পদত্যাগ করেছেন তা তারাই ভালো জানেন, এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।’
প্রগতিশীল সংগঠন থেকে আসা এনসিপির বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন নেতা নতুন দল গঠনের আলোচনা করছেন বলে যে কথা শোনা যাচ্ছে, সে বিষয়ে অলিক মৃ বলেন, ‘আমি শুনেছি যে নতুন দল তৈরির আলোচনা চলছে। তবে এ নিয়ে আমি এখনও কোনো প্রস্তাব পাইনি। যাব কী যাব না, সেটা ভবিষ্যতের বিষয়।’
সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব তুহিন খান তার পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে ‘কিছুটা ব্যক্তিগত’ উল্লেখ করে বলেন, ‘এই মুহূর্তে রাজনীতি করা আমার জন্য খুব একটা উপযুক্ত নয়। তাই একটি বিরতি নিচ্ছি।’
এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এনসিপি ক্রমশ ডানপন্থী দলে পরিণত হচ্ছে এটা বিভিন্ন জায়গায় তাদের অবস্থান ও বক্তব্য দেখলেই বোঝা যায়। ফলে আলাদা করে বলার কিছু নেই। তাদের রাজনীতির প্রভাব ও দিকনির্দেশনাও এখন অনেকটাই পরিষ্কার।’
যারা এনসিপি থেকে বের হয়ে এসেছেন, তারা একত্র হওয়ার চেষ্টা করছেন জানিয়ে তুহিন বলেন, ‘আমাদের অনেকেই নানা ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক অ্যাকটিভিজম চালিয়ে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে সেটা হয়তো কোনো প্ল্যাটফর্মে রূপ নিতে পারে, তবে এটা এখনই নিশ্চিত করে বলার সময় আসেনি। আমরা যারা বের হয়েছি, সবাই আপাতত কিছুটা সময় নিচ্ছি নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে। তাই এখনই কিছু ঘোষণা দেওয়া ঠিক হবে না।’
এনসিপির ডানপন্থায় ঝুঁকে পড়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে দলের যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদীন শিশির রিপোর্টার্স২৪-কে বলেন, ‘আমাদের নির্দিষ্ট কোনো আদর্শই নেই। ডানপন্থা, বামপন্থা কিংবা মধ্যপন্থা- এরকম কোনো পন্থাই এনসিপির গঠনতন্ত্রে নেই। এনসিপি গণতান্ত্রিক দল। গণতন্ত্রের জন্য যা করা দরকার তাই করবে।’
পদত্যাগকরা নেতাদেরকে ক্ষুদ্রকণা আখ্যা দিয়ে এনসিপির ভাঙন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এরা সামান্য ক্ষুদ্র কণা। এরা চলে গেলেই দল ভেঙে যাচ্ছে, বিষয়টা এমন না। এরা কিংবা আমি যদি আজ দল থেকে চলে যাই, তাতে দলের কোনো ক্ষতি হবে না। রাজনৈতিক দল হচ্ছে ট্রেনের মতো। একেক স্টেশন থেকে একেক জন নেমে যাবে, আবার কেউ কেউ উঠবে। তাতে তো দল ভেঙে যাবে না। যারা চলে গেছে, তারা নতুন দল করতেই পারে। সেটা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার।’
পদত্যাগী নেতারা যে এনসিপিকে ডানপন্থায় ঝুঁকে পড়ার কথা বলছেন, সে বিষয়ে দল কী ভাবছে এমন প্রশ্নে যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘এনসিপি ডানপšী’ দল হয়ে গেছে এই কথাটা সঠিক নয়। আমাদের নিয়ে যে প্রচারণা হচ্ছে, অনেকে তাতে বিভ্রান্ত হয়েছেন বা হয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু এনসিপি সবসময়ই তার মধ্যপন্থা এবং নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যেই থেকেছে এক মুহূর্তের জন্যও সেখান থেকে সরে যায়নি। ‘বড় দলে’ কিছু মতপার্থক্য বা বিভ্রান্তি ‘খুব স্বাভাবিক’। অনেকেরই বড় রাজনীতি করার অভিজ্ঞতা থাকে না, আর রাজনীতি একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া এখানে ধৈর্য লাগে। অনেকে আবেগপ্রবণ হয়ে ফেসবুকে কিছু লিখে ফেলেন, কিন্তু সেটা দলত্যাগের ইঙ্গিত নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যতজনের পদত্যাগের কথা শোনা যাচ্ছে, তাদের সংখ্যা খুব সীমিত। ‘দুই-একজন পদত্যাগপত্র দিয়েছেন বলে শুনেছি, তবে অনেকে কখনই দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন না। এসব নিয়ে আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব কাজ করছেন, আলোচনাও চলছে। এখনও বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত নয়।’
নেতাদের এনসিপি ছেড়ে যাওয়ার বিষয়ে কয়েকটি গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘গোয়েন্দা সংস্থা সব সময়ই সম্ভাবনাময় দলকে ভাঙার চেষ্টায় থাকে। আপনারা দেখছেন যে, দিল্লিবিরোধী অবস্থান থেকে আমাদের রাজনীতির ছকটা এসেছে। এই ছককে নষ্ট করার জন্য চেষ্টা যদি তারা না করত, তাহলে বরং আমি অবাক হতাম।’
সামান্তা শারমিন গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে আঙুল তুললেও কোন গোয়েন্দা সংস্থা, সেটা তিনি স্পষ্ট করেননি। তবে জয়নাল আবেদীন শিশির স্পষ্ট করেই বললেন ভারতের কথা। তিনি রিপোর্টার্স২৪-কে বলেন, ‘এনসিপিকে ভাঙার চেষ্টা করছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’। দলের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানোর জন্য দেশের কিছু মিডিয়াকে অর্থায়নও করছে তারা।’
তবে ভাঙনের এই চেষ্টা সফল হবে না বলেও আত্মবিশ্বাসী এই নেতা। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, তাদের চেষ্টা সফল হবে না। কারণ এখানে এজেন্ট হয়ে যারা ভাঙার কাজ করছে, সেই সংখ্যাটা খুবই কম।’
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব/এসসি