ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট: বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অবদান উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এ মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট। যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক স্মরণসভায় তিনি বলেন, একজন নারী হিসেবে খালেদা জিয়া যেভাবে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল ও অনুকরণীয়।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে গভীর শোক ও শ্রদ্ধা জানাতে এই স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। সভার আয়োজন করেন ন্যাশনাল প্রেসক্লাবের সদস্য ও মেক্সিকোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী। এতে ওয়াশিংটনের কূটনীতিক, সাংবাদিক, গবেষক ও নীতিনির্ধারকরা অংশ নেন।
গণতন্ত্রের সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ
স্বাগত বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী বলেন, “আমরা আজ শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করছি না। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রটেক্টর এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম নির্মাতা।”
তিনি বলেন, যখন দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়েছিল এবং বিরোধী মতের কণ্ঠ রুদ্ধ ছিল, তখন বেগম খালেদা জিয়া নির্ভীকভাবে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তার সাহস ও দৃঢ়তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য নজির।
১৯৭১ সালের প্রতিরোধ ও সাহসিকতার দৃষ্টান্ত
রাষ্ট্রদূত মুশফিক স্মরণ করেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানের সময় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র সরানোর উদ্যোগে বেগম খালেদা জিয়া বাধা দেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, স্বামী মেজর জিয়াউর রহমানের অনুমতি ছাড়া অস্ত্র সরানো যাবে না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেওয়া এই অবস্থান ছিল প্রতিরোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার
রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য বেগম খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে কারাবন্দি করা হয়েছিল। এসব হয়রানিমূলক মামলার বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশে প্রতিবাদ হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে এসবকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ড্যান মজিনা: “তিনি ছিলেন উন্মুক্ত ও উদার হৃদয়ের মানুষ”
বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া অন্যকে সম্মান দিয়ে নিজেও সম্মানিত হতেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি অন্যদের খোঁজখবর নিতেন।”
তিনি বলেন, রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত সহজ ও আন্তরিক। “আমি যখনই তার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছি, তিনি সময় দিয়েছেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মানবিক ও আন্তরিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী।”
মজিনা আরও বলেন, অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্য দিয়েও তিনি কখনো হাল ছাড়েননি বা অভিযোগ করেননি। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উন্নয়নে তার ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মার্শা বার্নিকাট: অভিযোগ নয়, হাসিই ছিল তার শক্তি
সাবেক রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেন, “বহু নির্যাতন সহ্য করেও বেগম খালেদা জিয়া কখনো অভিযোগ করেননি। সংকটের মধ্যেও তিনি ছিলেন হাস্যোজ্জ্বল ও আন্তরিক।”
তিনি বলেন, সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে রমজানের ইফতার—সব আয়োজনেই তার অতিথিপরায়ণতা সবাইকে মুগ্ধ করত। “বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ততদিন মানুষ খালেদা জিয়ার লিগ্যাসি স্মরণ করবে।”
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও শ্রদ্ধা
ন্যাশনাল প্রেসক্লাবের নবনির্বাচিত ১১৯তম প্রেসিডেন্ট মার্ক শেফ বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক চ্যাম্পিয়নের স্মরণসভা আয়োজন করতে পেরে তারা গর্বিত। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত।
সাংবাদিক ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, ১৯৮১ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর অনিবার্য পরিস্থিতিতে তিনি রাজনীতির দায়িত্ব নেন এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক এহতেশামুল হক বলেন, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি সারাজীবন গণতন্ত্রের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তজা বলেন, গণতন্ত্র ও জাতীয় রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের অবদান অনস্বীকার্য।
তথ্যচিত্র প্রদর্শনীতে আবেগঘন মুহূর্ত
আলোচনার আগে বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। তথ্যচিত্রটি উপস্থিত অতিথিদের আবেগাপ্লুত করে তোলে।
গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে অম্লান স্মৃতি
ওয়াশিংটনে আয়োজিত এই স্মরণসভা ছিল গণতন্ত্রের এই মহান নেত্রীর প্রতি আন্তর্জাতিক শ্রদ্ধা ও সম্মানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করে, গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার নাম বিশ্বমঞ্চে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও শ্রদ্ধার।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি